ছোটগল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০১৮ ইং

তোমারও অসীমে
নীহার চক্রবর্তী 


সুধামামা বিয়ে করেছে।
আমরা তার কিছুই জানতাম না। মাকে ফোনে জানিয়েছে মার এক পুরনো বন্ধুপাড়া থেকে। সেও তেমন একটা জানে না। শুধু জানে মামা বিয়ে করেছে। বাড়িতেও নাকি বৌকে তোলেনি। সুধামামা এখন বৌ নিয়ে কোথায় আছে কেউ জানে না।
আমরা দুই ভাই-বোন মার মুখে এসব শুনে খুব হতাশ।
অনেক সাধ ছিল মামার বিয়েতে খুব আনন্দ করবো। তার পরিকল্পনা চলছিলো। তাই আমরা মুখ শুকনো করে বসে থাকলাম। মারও মেজাজ ঠিক নেই। একটাই তো ভাই। শখ ছিল কম ?
তবু মা বলল আমাদের, “বাবার সামনে কিচ্ছুটি বলবি না। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। কি যে করে বসলো আমাদের সুধা।”
আমরা মার ব্যথা বুঝতে পেরে চুপ করে গেলাম। দুজনে শপথ নিলাম বাবার সামনে কিছু না বলার জন্য।

ওমা, বাবাও তো জেনে গেছে !
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরেই মজার সুরে বলল মাকে, “সুধা ভাগ গায়া। এ ক্যায়া হুয়া।”
মার শুনে সারা শরীর জ্বলে গেলো তখন।
বেশ রাগের সঙ্গে বলে উঠলো বাবাকে, “তোমার বোন তনু কি করেছিলো ? মনে নেই কিছু ? শুধু আমাদের বেলায় রহস্য ? বাজে কথা ছাড়ো। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য। সুধার পিছনে অনেক মেয়ে ঘুরছিল।”
বাবা মার কথা শুনে মুচকি হেসে ক্লান্তদেহে দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালও।
আমরা মা-বাবার কথা শুনে একটি কথাও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলাম না। মার জন্যই ব্যথা আমাদের বেশী ছিল।
কিন্তু বাবা যে কোথা থেকে জানলো, সে আমরা কেউই বুঝতে পারলাম না। মার জানার ইচ্ছাও ছিল না।
তারপর মা দুদিন চুপচাপ।
সুধামামার খবর নিতে চাইলো না। আমরাও কিছু বললাম না মামার ব্যাপারে মাকে। তবে বাবার হাসির মধ্যে ছিল ব্যঙ্গের ছোঁয়া। মা মুখ বুজে সব সয়ে গেলো। মামার আসল খবর জানা আগে জরুরি ছিল মার কাছে। আমরা বুঝলাম।
পরেরদিন সকালের দিকে সুধামামার নাম ভেসে উঠলো মার ফোনের স্ক্রিনে। আমিই প্রথম দেখে খুব খুশি হয়ে ছুটে গেলাম মার কাছে। মা হাতে ফোন নিয়ে আনন্দে আটখানা। বোন তো মার আঁচল চেপে ধরে মুখে খুশি-খুশি ভাব নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। বাবা তখন পাশের ঘরে। কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে।
মামাই প্রথম কথা বলল মার সঙ্গে বেশ হাসতে হাসতে।
মাকে বলতে থাকলো, “দিদি, খুব সুখবর আছে। আমি বিয়ে করেছি। বিয়ে করেছি আমার ইচ্ছায়। তবে এখন বৌ রেবেকাকে নিয়ে আমি খুব খুশি।”
‘রেবেকা’ শুনে মা তখন যেন আকাশ থেকে পড়লো।
প্রায় অস্ফুট গলায় মামাকে বলল, “মানে মুসলমানের মেয়ে আমাদের বৌ ? কী কেলেঙ্কারি করেছিস তুই। তারপর ?’’
মামা সেই হাসি নিয়ে বলল, “আরে, বলিস না। সেলিম আমার পরম প্রিয় বাল্যবন্ধু। তুই ওকে চিনিস বেশ। ওর বোন রেবেকা। একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। তবে লেখাপড়া অনেক। পরে বড় চাকরি পেতেও পারে। সে যাক। সেলিম রেবেকার বিয়ের কয়েকদিন আগে জানতে পারে ওর হবু বর বড় চাকরি করলেও বদ্ধ মাতাল আর চরিত্রহীন। সময়ও নেই আর। ছেলে জোগাড় করা খুব কঠিন। সেলিম আমাকে দুঃখ করে বলতেই আমি রাজি হয়ে গেলাম। খারাপ কিছু, দিদি ?’’
আমরা অবাক হলাম দেখে। মা মামার সঙ্গে তেমন কথাই বলতে পারলো না পরে। মার গাল বেয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকলো।
শুধু একটা কথাই মা বলল মামাকে, “খুব ফারহাজের কথা মনে পড়ছে আজ। তুই পেরেছিস। আমি পারিনি। অনেক শুভকামনা তোদের দুজনের জন্য।”
বলেই মা ফোন কেটে দিয়ে ঘরে চুপচাপ বসে থাকলো। মা তখন অঝোর-ধারায় কাঁদছে। আমরা মাকে ঘিরে আছি। বাবা ঘরে এসে সব দেখল। জানিনা সব জেনেছে কিনা আগে। তবে কিছুই না বলে চুপটি করে নিজের ঘরে চলে গেলো খানিক পরেই।
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন