ছোটগল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০১৮ ইং

চিঠি
বিভাবসু দে  


আজ রোববার, কলেজ ছুটি, কাজকর্মও তেমন কিছুই নেই। তাই সকাল থেকে বেশ আমোদ করে ল্যাপটপে সিনেমা দেখেই দিনটা কাটল। দুপুরে মেসে কষা মাংস দিয়ে খাবারটাও বেশ পেল্লাই হয়েছে; এবার এই দুপুরবেলা বাঙালির প্রিয়তম কাজটিই সারা যাক, মানে নিদ্রাদেবীর স্নেহমাখা কোলে লুটিয়ে পরে পরমসুখে নাক-ডাকানো! বিছানায় শুয়ে মোবাইলে গান শুনতে শুনতে তখন প্রায় চেতন থেকে অবচেতনলোকে যাত্রার অন্তিম পর্যায়ে চলে এসেছি, ঘুম বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে; হঠাৎ এমন সময় দরজায় সজোরে কে যেন ঠক-ঠক করে কড়া নাড়তে লাগল, দিল পুরো ঘুমটা চটিয়ে.....ইচ্ছে করছিল যদি ঋষি দুর্বাসা হতাম তো এক্ষুনি অভিশাপ দিয়ে ভস্ম করে দিতাম ব্যাটাকে! এ নিশ্চই হোস্টেলেরই কোনো হতভাগা হবে।
বেশ বিরক্ত হয়েই দরজাটা খুললাম। না এ যে পোস্টম্যান দেখছি, চিঠি এসেছে আমার নামে; এই মোবাইলের যুগে কে আবার চিঠি পাঠালে! সই-সাবুদ করে চিঠিখানা নিয়ে পোস্টম্যানকে বিদেয় করলাম।
হুম, দেখা যাক এবার কার চিঠি। প্রাপকের কলামে আমারই নাম-ঠিকানা লেখা, কিন্তু প্রেরক....না না, এ যে প্রেরিকা দেখছি; শ্রেয়সী গাঙ্গুলি......এনার নামটি তো মোটেও পরিচিত ঠেকছে না।
আচ্ছা, দেখাই যাক না কি লিখেছে; খামখানা খুলে চিঠিটা বের করলাম.......উরি বাস !! এ যে বিয়ের চিঠি। মনটা খুশিতে টগবগ করে উঠল; এতদিনে তবে একখানা নেমন্তন্ন পেলাম বোধহয়।
আগামী শুক্রবার বিয়ে, নৈশভোজনের আমন্ত্রণ। বিয়ের কনের জায়গায় পত্র প্রেরিকারই নাম লেখা। কিন্তু এখনও ওই নামে কাউকে চিনি বলে তো খেয়াল করতে পারছি না; তা যাকগে, হবে হয়তো কোনো দূরসম্পর্কের আত্মীয়া, ক’জনকেই আর চিনি আমি!
খামটা খুলতে গিয়ে ভেতর থেকে একখানা ভাঁজ করা সাদা কাগজ বেরোল, খুলে দেখলাম হাতে লেখা একটি চিঠি, তার বক্তব্যখানা এরকম ----

সৌনক,
আজ হঠাৎ চিঠিখানা পেয়ে হয়তো অবাক হয়েছ। জানি, আমাদের সম্পর্ক অনেকদিন আগে আমিই শেষ করে দিয়েছি; তারপর বহুদিন কোনো যোগাযোগও হয়নি আমাদের, তুমি মেসেজ করেছিলে অনেকবার কিন্তু আমিই আর উত্তর দেইনি। যখন সম্পর্কটা ভেঙেছিলাম তখন হয়তো অনেকটাই আঘাত পেয়েছ তুমি, অনেক কষ্ট হয়তো দিয়েছি তোমাকে; যদি পারো ক্ষমা করে দিও সেসবের জন্যে।
আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে, একটা নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি ; সেই শুভমুহূর্তে সব পুরোনো ভুল বোঝাবুঝি মন থেকে মুছে দিয়ে যদি উপস্থিত থাক তাহলে বুঝব যে তুমি সত্যিই আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ। আমার মনের বহুদিনের জমে থাকা বোঝাটা হাল্কা হয়ে যাবে।
আশা করি প্রাক্তন প্রেমিকার এইটুকু আবদার তুমি রাখবে।
ইতি শ্রেয়সী
বিঃ দ্রঃ বিয়ের কার্ডটা সাথে নিয়ে এস।

চিঠিখানা পড়ে তো আমার চক্ষুস্থির। রাতারাতি প্রেমিকা জুটে গেল, আবার তায় কিনা বিয়েও হতে চলেছে! কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যাটা হল, ইহজন্মে প্রেমে পড়ার ভাগ্য আমার কোনোদিনই হয়নি, তাহলে এই প্রেমিকাটি জুটলো কোত্থেকে!
খামটা আরেকবার উল্টেপাল্টে দেখলাম, হ্যাঁ আমার নাম-ঠিকানাই তো লেখা।
এ তো মহা ফ্যাঁসাদে পড়া গেল; মেয়েটি চিঠিতে ফোন নম্বরও লিখেনি যে ফোন করে জিজ্ঞেস করবো।
বেশ কয়েকবার চিঠি-খাম সবকিছু আবার উল্টেপাল্টে দেখলাম, যদি কোনো সূত্র পাওয়া যায়, যদি বুঝতে পারি যে ভুলটা কোথায় হচ্ছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কিছুই উদ্ধার করতে পারলাম না; নাম-ঠিকানা হুবহু আমার সাথে মিলে যাচ্ছে কিন্তু চিঠির বক্তব্য আমার জীবনের কোনো ঘটনার সাথে একবর্ণও মিলছে না। যেই শ্রেয়সী গাঙ্গুলি নামক মহিলা নিজেকে আমার প্রাক্তন প্রেমিকা বলছেন, তার নামটা অবধি আমি কস্মিনকালে শুনিনি!
অনেকক্ষণ এভাবে বসে রইলাম চিঠিটা নিয়ে, ভাবতে ভাবতে কপাল অবধি ঘেমে উঠল, কিন্তু কিছুই কুলকিনারা পেলাম না। হঠাৎ কেমন একটা খটকা লাগল; এটা আমারই কোনো মহানুভব বন্ধুর মস্করা নয়তো!
মোবাইলখানা হাতে নিয়ে একে একে এমন যত বাঁদরমার্কা বন্ধু আছে আমার সবগুলোকে ফোন করলাম, কিন্তু সবাই বললে এ তাদের কীর্তি নয়, আর কেউ মিথ্যে বলছে বলেও তো মনে হল না। ঘুরে ফিরে আবার যেই অগাধ সলিলে ছিলাম সেখানেই এসে পড়লাম, এই রহস্যময়ী প্রেমিকার কিছুই কিনারা করা গেল না।
একবার ভাবলাম বিয়েবাড়ির ঠিকানায় গিয়ে দেখলে কেমন হয়; কিন্তু তখুনি মনে নানান চিন্তারা উঁকি মারতে লাগল ...... যদি এই চিঠির পেছনে কোনো খারাপ চক্রান্ত থাকে, অথবা যদি মেয়ের বাড়ির লোকজন আমায় সত্যিই মেয়েটির প্রাক্তন প্রেমিক ভেবে পেটাতে শুরু করে! দিনকাল যা পড়েছে কখন কী হয় তার ভরসা কোথায়!
একবার ভাবলাম পুলিশকে জানালে কেমন হয়, তারপর মনে হল এতো সামান্য ব্যাপারে থানা-পুলিশ করতে যাওয়াটা বোধহয় বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। শেষ অবধি অনেক সাত-পাঁচ ভেবে যখন কোনোই ফল হল না তখন সেদিনকার মত চিঠিটি রেখে দিলাম, কিন্তু মনটা খুঁত-খুঁত করতে থাকল সারারাত।
পরদিন সোমবার, যথারীতি ছুটতে হল কলেজে। সকাল ন'টা থেকে রাত ন'টা, পুরোদিন ল্যাবেই কেটে যায়; সারা সপ্তাহের ব্যস্ততায় ওই চিঠিটির কথা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। একটি একটি করে দিন গড়িয়ে শুক্রবার এসে হাজির; দুপুরবেলা হঠাৎ মনে পড়ল চিঠিটার কথা, আজই তো বিয়ে।
মনের মধ্যে একটা ভীষণ দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল, কি করি, যাব একবার, নাকি যাওয়াটা ঠিক হবে না; কিন্তু মনের কৌতূহলটাও যে বাঁধ মানছে না। অনেক ভেবে শেষে এক মধ্যপন্থা বের করলাম.......যাব কিন্তু একা নয়, একজন কাউকে সাথে নিয়ে যাব। পার্থ আমার সাথেই ল্যাবে কাজ করে, তাকেই রাজি করালাম; তবে সত্যি কথাটা বলিনি, বললাম আমার এক দুঃসম্পর্কের বোনের বিয়ে।
সাড়ে-আটটা নাগাদ আমরা গিয়ে পৌঁছলাম চিঠিতে লেখা ঠিকানায়; হ্যাঁ বিয়ে বাড়িই বটে, বেশ লোকজনে ভরা , রাস্তায়ও অনেকটা অবধি লাইট লাগিয়েছে।
দুপাশে কলাগাছ বাঁধা সুসজ্জিত গেটের কাছে পৌঁছতেই চোখে পড়ল এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত; হাবভাবে বুঝলাম ইনিই মেয়ের বাবা। বিয়ের কার্ডটা হাতে নিয়েই সোজা এগিয়ে গেলাম ওনার দিকে, "মেসোমশাই, একটা কথা বলার ছিল।"
ভদ্রলোক আমার মুখ না চিনলেও হাতে কার্ডখানা দেখে আতিথেয়তায় একেবারে গদগদ হয়ে বললেন, "আরে এস এস বাবা, ওসব কথা-টথা পরে হবে আগে খেতে বসে পড়, এইমাত্র প্রথম ব্যাচ বসেছে।" বলতে গেলে প্রায় জোর করেই উনি বসিয়ে দিলেন আমাদের, কোনো কথা বলার সুযোগই পেলাম না। যদিও ওই চিঠির বা এই নিমন্ত্রণের প্রকৃত উদ্দেশ্যব্যক্তি আমি হতেই পারি না, তবু ভগবান যখন মুখের সামনে এমন যেচে সুযোগ দিচ্ছেন তখন ভাবলাম ভুড়িভোজটা হাতছাড়া করা মোটেও ঠিক কাজ হবে না।
খাওয়াটা বেশ ভালোই হল, কিন্তু যতক্ষণে আমরা কব্জি ডোবানো সারলাম ততক্ষণে কনে বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়েছে, চারিদিকে আত্মীয়ের ভিড়, এরমাঝে চিঠির কথাটা তোলা অসম্ভব। ভিড়ের ফাঁকে শুধু একবার মেয়েটির মুখ দেখতে পেলাম, নিশ্চিন্ত হলাম, একে অন্তত আমি কোনোভাবেই চিনি না। কিন্তু এখন কি করা, এই অনুষ্ঠানের মাঝে তো কোনোমতেই এর সাথে কথা বলা সম্ভব নয়; অগত্যা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমরা দুজনেই একখানা অটো করে হোস্টেলের পথ ধরলাম। যেতে যেতে ভাবছিলাম কাজটা কি ঠিক হল; কিন্তু কিছু করারও তো উপায় ছিল না সেই মুহূর্তে। যাকগে, বিয়ে যখন হয়ে গেছে এখন সুখে থাক মেয়েটি, শুধু শুধু চিঠি নিয়ে ঝামেলা করে লাভ কি! ভগবানেরও বোধহয় সেটাই ইচ্ছে, তাইতো বাড়ি অবধি গিয়েও বলার সুযোগটা পেলাম না।
সেদিন খাওয়াটা একটু গুরুতরই হয়েছিল তাই ঘরে ফিরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেরও খেয়াল নেই।
পরদিন থেকে আবার সেই কর্মব্যস্ত জীবন; ধীরে ধীরে কাজের চাপে ভুলেই গেলাম এসব ঘটনা। প্রায় দু'সপ্তাহ পর একদিন সকালে হোস্টেল থেকে ল্যাবে যাচ্ছি, হঠাৎ নিউ হোস্টেলের সামনে এক সিনিয়র দাদাকে দেখলাম রীতিমত বসে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছে, আর পাশে আরও দুজন বসে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে; ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারলাম না। ল্যাবে গিয়ে পার্থকে জিজ্ঞেস করলাম, "কিরে নিউ হোস্টেলের সামনে দেখলি? ব্যাপারটা কি বলতো।"
পার্থ একটু ঠাট্টার ভঙ্গিতেই বলল, "কিছু না, ওই দেবদাস কেস! গত শুক্রবারের আগের শুক্রবার, ওই যেদিন তোর বোনের বিয়েতে গেলাম, সেদিনই নাকি এই দাদার কোন এক প্রেমিকারও বিয়ে হয়ে গেছে। গতকাল রাতে খবরটা জানতে পেরে তখন থেকে কেঁদে মরছে ব্যাটা!"
এবার আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল, কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "দাদাটার নামটা জানিস কি ?"
পার্থ হেসে বলল, "তোরই নাম, এমনকি পদবীটাও এক, সৌনক চক্রবর্তী। আরও মজার ব্যাপার কি জানিস, দু'বছর আগে তিনি ওল্ড হোস্টেলে তোর রুমটাতেই থাকত, এখন নিউ হোস্টেলে থাকে।"
আমার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল, সেদিন আর একটাও কথা সরেনি আমার মুখে।
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন