মুক্তগদ্য

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন গ্রীষ্ম সংখ্যা মে ২০১৭ ইং 

ছেলেবেলার প্রথম দশবছর
অরুণিমা চৌধুরী 


ছেলেবেলা এমন একটা পুঁটলি, যেখানে হাত ঢোকালে সব প্রথমগুলো উঠে আসে, তাই.. "এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু.. পালাতে চাই যত সে আসে, আমার পিছুপিছু ".. নাহ। পালাতে চাইনা। মুখ লুকোতে চাই। আমার এলেবেলে ছেলেবেলাটা, আমার ভ্যালবেলে ঢিলে ইজের নেড়া মাথা আর সাদা নিমার ছেলেবেলাটায় উঁকি দিলে, মনে পড়ে কতকিছু..

সেই রাতটা জলের রাত। আমার একদম প্রথমদিকের স্মৃতি.. দেওয়াল বেয়ে জল পড়ে মশারি ভিজে যাচ্ছে..সারা ঘরে ছাদ চুইয়ে টোপা জল আমার মজা লাগছে, মা আমায় কোলে নিয়ে গোটা রাত টেবিলের তলায়..সেবার খুব বন্যা হয়েছিল।

সেই ছোট্টবেলার আরেকটা স্মৃতি ভীষণ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়.. তখন সম্ভবত আমি বছর তিনেক, ভাত খেতে চাইছিনা। মা গল্প করছে, আগের রাতে জ্যেঠির উঠোনের চাপা দেওয়া ঝুড়ির মধ্যে থেকে কীভাবে বনবিড়ালে মুরগি ধরে নিয়ে গেছে, কীভাবে গলাটা ছিঁড়ে খেয়েছে। আমি প্রশ্ন করছি, এই ডিম টা কি ওই মুরগিটার.. আমার চোখের সামনে ভাসছে গলা কাটা রক্ত মাখা মুরগির ছবি.. আমার ওয়াক পাচ্ছে.. বুঝিয়ে বলতে পারছিনা.. শেষপর্যন্ত হড় হড় করে বমি।

আমাদের তিন কামরার ছোট্ট বাড়িতে একটা ঘরে তখন ভাড়াটে, আরেকটা ঘরে আমরা। ভাড়াটে কাকিমার ছেলেটি আমার থেকে বছর খানেকের ছোট, নাম -- গজ.. কোনকালে অজয় থেকে অজ, তার থেকে যে গজতে রূপান্তরিত হয়েছে, সে বোধহয় কাকিমাও ভুলে গেছেন এতোদিনে। তা সেই গজ হল গিয়ে আমার বুজম ফ্রেন্ড। তখনকার দিনে বাচ্চাদের চেপে কোলে শুইয়ে চোখে টেনে টেনে কাজল পরিয়ে দেওয়া হত। আমার মায়ের ধৈর্য এবং আমার সহ্য কম হওয়ায়, প্রায়শই পালিয়ে কাকিমার কোলে উঠে পড়তাম। আর কাকিমাও দিব্যি কোন কায়দায় কাজল পরিয়ে ভদ্রসভ্য সামাজিক করে তুলতেন। সেই গজ আর আমার একই সাথে পালা করে একবার কাকিমার, তো আরেকবার নিজের মায়ের স্তন ভাগ করে নেওয়া, একবার পাশবালিশের অধিকার নিয়ে ঝগড়া মারপিট..আরেকবার ঝাঁটার কাঠি ভেঙে ভেঙে গজ'র পেটে সাজিয়ে সেলাই সেলাই খেলা।
সঞ্জয় গান্ধী যেদিন মারা গেলেন, আমরা দুই ভাইবোন মিলে এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম, লোকটা খুব ভালো ছিল, বাচ্চাদের ভালবাসতো তো, তাই ভগবান ওকে মেরে ফেলেছে। ভগবানটা তো খুব পাজি, এই যেমন আমার বাবাকেও মেরে ফেলেছে!

এরপর একটু একটু করে লেখাপড়া শুরু। গজরা চলে গেলে, কাকু ওই ঘর ভর্তি টিউশন পড়াতে শুরু করলো। সারাঘরে সতরঞ্চি পেতে সবাই পড়তো, আমিও স্কুলে ভর্তি হবার আগেই শিখে গেলাম অ আ, এক দুই.. এ বি সি ডি.. অনেক কিছু।
এইসময় থেকেই, সকালে মা স্কুলে চলে গেলে আমার জিম্মাদার তখন জ্যেঠি। জ্যেঠি গোবর ছেনে ঘুঁটে দেয়, আমিও ছোট্টছোট্ট বিস্কুটের মতো ঘুঁটে দিই। "জ্যেঠি, এই ঘুঁটেগুলা আমারে দিবা তো!"
জ্যেঠি দুধ দিতে যায় বাড়ি বাড়ি, আমি ট্যাঁকে। জ্যেঠির সকালের জলখাবার, জল দেওয়া বাসি পান্তা ছেঁকে কালোজিরে কাঁচা লঙ্কা আর নুন হলুদ মিষ্টি দিয়ে ভাত ভাজা..পাঁচ ছেলেমেয়ের সাথে আমিও.. বিরক্ত করি খুব, রান্না করতে দিইনা, মায়ের জন্যে মন খারাপ করলেই, ছুট্টে এসে বারান্দায় মেলা মায়ের কাপড়খানা জড়িয়ে চুপচাপ মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকি, জানি আমার কাঁদতে নেই। জ্যেঠি বুঝতে পারতো সব। কাজ ফেলে, বুকে নিয়ে শুকনো স্তন মুখে গুঁজে দিলেই ঘুমিয়ে পড়তাম...
এর ফাঁকে ফাঁকে বেশিরভাগ দিনই ছোট্ট অ্যালুমিনিয়াম বাক্সটায় গোটাকতক বই আর একটা ফ্রক বগলে কাছেই মামাবাড়ি বা সেজো দিদার বাড়িতে আমাকে চালান করা হত, যে সময়টার কথা বলছি, তখনো স্কুলে ভর্তির বয়েস হয়নি। সেজো দিদা মানে মায়ের সেজো কাকিমা।
যেদিন সেজো দিদার বাড়ি যেতুম, রান্নাঘরে চাল ভিজানো দেখলেই খলবল করে ভেজা চাল ছানতে বসতুম, হাত থেকে ছোট ছোট দানা গুলো পিছলে যেতো, সেইটে ছিল খুব মজার খেলা। সেজোদিদার বাড়িতে মায়ের বাল্যবিধবা পিসি থাকতেন, তাঁর পিতৃদত্ত নামটি যে কী.. সেকথা আমি জানিনা, তবে তিনি আমাদের কোদাল দিদা। অমন রূপসী মানুষটার কেন যে অমন বিতিকিচ্ছিরি নাম হয়েছিল, জানা নেই, তবে তাঁকে আমি এক্কেবারে পছন্দ করতাম না। আমায় দেখলেই গান ধরতো, "মিঠাইয়ের বর এসেছে ন্যাংটা লো ন্যাংটা, অমিতা মাথায় দেলো ঘোমটা".. আসলে এর পিছনের গল্পটি হল, সেই সময়, পাড়ায় রাধু পাগলার আবির্ভাব হয়েছিল। সে বেচারি অবশ্যই ঠিকঠাক জামাকাপড় পরতো না, কোমর ছেঁচড়ে চলতো, সে ভালো কথা, তবে কাউকে কখনো মারধোর করে-টরে নি। একদিন বিকেলে কয়েকটি আম কেটে আমি মারফত মা রাধুকে পাঠালে, বসে থেকে দায়িত্ব নিয়ে সেই আম তাকে খাইয়ে এসেছিলাম.. তো বলাই বাহুল্য, এরপর থেকে পাড়ার হল্লা বাহিনী, বা বড়রাও কী করে যেন টের পেয়ে গেলো, "রাধুর সঙ্গে তোর বিয়ে দেবো" গোছের সস্তা ঠাট্টাগুলোয় আমি ভয়ানক রেগে যাচ্ছি, এবং ক্রমাগত রাধুকে ডিফেন্ড করে চলেছি।
সেই সময়গুলো অনেক অনেকদিন একদম একরকম.. দিদার বাড়ি, মামার বাড়ি, জ্যেঠির বাড়ি.. যেখানেই রেখে যাক, সময় পেরিয়ে গেলেই, মায়ের জন্যে মনখারাপ, ফ্রকটা দলা পাকিয়ে বগলে গুঁজে, হাতে বাক্সটা নিয়ে রাস্তার দিকে অসহায় তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা.. এক একদিন। মা ফিরতো না.. স্কুল থেকেই হয়ত কোন কাজে চলে গেলে, সেদিন আমি ওভাবেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম পাথর হয়ে। কখনো কাঁদতাম না, অথচ ওই সময়টায় আমার সামনে কেউ জোর দেখাতো না..

এরপর আমি স্কুলে ভর্তি হলাম, বাংলা মিডিয়াম প্রাইমারি স্কুল। লেখাপড়া করতে মন্দ লাগেনা..কিন্তু একদিন দাদুবাড়ি, মামাবাড়ি.. সব একে একে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো.. এই যারা উদ্‌বাস্তুর মতো একবার এই বাড়ি, একবার ওই বাড়ি করে, তারা বোঝে.. অতিথ কখন অযাচিত হয়.. আমি যে নিত্য অতিথ! সেই ক্লাস ওয়ানেই কেমন সব চটপট বুঝে নিলাম, একটা বাড়িতে বারবার থাকতে নেই। সেই থেকে শুরু হল কাকুর সঙ্গে সাইকেলে পাড়ি দিয়ে প্রায় ন-দশ কিলোমিটার রাস্তা উজিয়ে কাকুর বাড়ি যাওয়া.. শুধু দুমুঠো খাবারের জন্য। সহিষ্ণুতার শিক্ষা.. ঝড়জলে সিট নয়, শুধুমাত্র রডের উপর বসে রোজ অতটা পথ আমি পাড়ি দিতাম। কাকুর ধারালো চটির ঘষায় পায়ের গোড়ালির ছাল উঠে ঘা হয়ে যেতো। ঝড়জলে ভিজে টনসিল পেকে জ্বর আসতো, খিদে চেপে রাখা আমার রোগের লিস্টে পার্মানেন্টলি জায়গা করে নিলো গ্যাস্ট্রাইটিস। সকালে মা স্কুলে বেরোনোর আগে চা আর দুটো বিস্কিট, তারপর স্কুলে যেতুম একটা বাপুজি কেক নিয়ে, সেই প্রথম আবিষ্কার করেছিলুম, বাপুজি কেকে প্রতিদিন পিঁপড়েটা খুঁজে বের করাও একটা ভালো খেলা। ফিরে এসে ড্রেসটা একা একা পালটে নিয়েই কাকুর সঙ্গে দৌড়। সেখানেও দিদা, পিসি, ছোটকাকু, বড়কাকু, কিন্তু সেটা আমার আপনার জায়গা ... দিদা তাড়াহুড়োয় ভাত মেখে খাইয়ে দিতো, স্নান করিয়ে আমার সত্য সাঁইবাবার মতো ঝাঁকড়া চুল শ্যাম্পু করে, আঁচড়ে, অযত্নের ছাপগুলো রোজ মুছে দিতো। আমার দিদুন..সম্পর্ক গুলো রক্তের না হলে বাঁধনটা বড় তীব্র হয়, তাই না! মায়ের সঙ্গে সেই শিউলি গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ভিড় বাস ঠেঙিয়ে আবার বাড়ি। উনোন ধরিয়ে রান্না হতে হতে দুটো, আড়াইটে বেজে যেতো।.. সেই ছোট্ট থেকে আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠতে উঠতে যখন, ক্লাস টু, ততো দিনে ঘরমোছা, বাসনগুলো মেজে দেওয়া ঝাঁট দেওয়া, বিছানা করা বা তোলা.. সবজি কেটে দেওয়া.. আমি শিখে ফেলেছি। শিখে ফেলেছি হার্টের রুগি মা মাঝেমাঝেই অজ্ঞান হয়ে গেলে একা একা দরজা কী করে খুলতে হয়, কী করে রুটি বেলতে হয়, কী করে আরো আরো অনেক কিছু.. যা বোঝার নয়.. .. বুঝে ফেলেছি, পড়াশুনো আমার একমাত্র এক্সেলেন্সি, কোন আত্মীয় নেই, বন্ধু নেই, শুধু ঘরভর্তি বই ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রথম পড়তে শিখলাম যখন, মা বলতো, যা পাবি বানান করে জোরে জোরে পড়বি, মানে বুঝতে হবেনা..আমি বানান করতে করতে দেশ পড়তে শুরু করলাম, বানান করতে করতে পড়ে ফেললাম, অনেক কিছু.. যার জলদি জলদি বড় হয়ে উঠতে হয়, জীবন যাকে কুঁড়িতে ফুটিয়ে দেন.. সে সাড়ে আটেই নারী হয়ে ওঠে..সামলাতে শিখে ফেলে আস্তে আস্তে ঘটে চলা পরিবর্তন, ঈশ্বর কিনা জানিনা, প্রকৃতি আমায় বিদ্রোহী করে পৃথিবীতে পাঠানোর ফলে, জনসমক্ষে আমার বেড়ে ওঠা শরীরটা নিয়ে মায়ের সঙ্কোচবোধ, কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে নিজেকে খোলসে মুড়িয়ে রাখার চেষ্টা, মাত্র সাড়ে আটবছরেই আমাকে সকলের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল বহিরঙ্গেও... দশ বারো তেরো হবার আগেই আমার শৈশব ফুরিয়ে গিয়েছিল।
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন