গল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন হেমন্ত সংখ্যা নভেম্বর ২০১৬ ইং 

চক্রব্যূহ
সদানন্দ সিংহ

হঠাৎ কানের কাছেই যেনো গাঁক – গাঁক – গুঁক করে একটা আওয়াজ। ক্লান্ত হয়ে অফিস থেকে ফিরে শচীন্দ্র চেয়ারে একটু বসতে যেতেই এই অমানুষিক আওয়াজটা শুনে চমকে ওঠে। আওয়াজটা আবার হয়। গাঁক – গাঁক – গুঁক। চেয়ারে না বসেই সে দাঁড়িয়ে যায়। আওয়াজটা কীসের তা সে বুঝতেই পারে না। এইসময় কুসুম ঘরে ঢুকতেই সে কুসুমকে জিজ্ঞেস করে, ওটা কীসের আওয়াজ ?
কুসুমের হাতে একটা গামছা। ও হয়তো একটু আগে হাত মুছছিলো ওটাতে। গামছাটাকে আলনায় ঝুলিয়ে দিয়ে কুসুম জবাব দেয়, হেমেন্দ্রবাবুদের শুয়োর। সকালের দিকে একটা শুয়োরকে বাঁধা অবস্থায় উনাদের বাড়িতে ঢোকাতে দেখেছি। পালবার জন্যে বোধহয়।
কুসুমের মুখ থেকে কথাগুলি শোনার পর শচীন্দ্রের চোখে-মুখে বিরক্তির চিহ্ন ফুটে ওঠে। ধপ করে চেয়ারে বসে বলতে থাকে, পালবার জন্যে আর জিনিস পেলো না। আজ থেকে শুরু হলো আরেক যন্ত্রণা। একটু শান্তিতে থাকবো তারও উপায় নেই। যত্তোসব –।
এবার শুয়োরটা ঘ-র-র-র করে আওয়াজ করে ওঠে। শচীন্দ্র ডান হাতে কপালের দুপাশটা চেপে শব্দ করে, উঃ। জ্বালালে দেখছি।
কুসুম ঘর থেকে বের হয়ে যাবার সময় একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, চা করবো?
--- করো।


মিলি চা নিয়ে ঢোকে। শচীন্দ্র ততক্ষণে অফিসের জামাকাপড় ছেড়ে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় এক কোণে বসে পত্রিকার পাতা উলটাচ্ছে।পত্রিকার চারিদিক জুড়ে খুন, জখম, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুট-ছিনতাই, উগ্রপন্থী কার্যকলাপ, ধর্ষণ, আমেরিকা-রাশিয়া-চিন-পাকিস্তান ইত্যাদি সব সংবাদে পরিপূর্ণ। এইসব সংবাদ না থাকলেও পত্রিকাগুলিকে পানসে মনে হয়। সংবাদগুলি যখন শচীন্দ্র একটা ঔৎসুক্য নিয়ে পড়ছে তখনই মিলি বলে ওঠে, বাবা চা।
এইসময় আবার শুয়োরটা আবার গাঁক – গাঁক – গুঁক করে ডেকে ওঠে। ইতিমধ্যে আওয়াজটা একটু গা সহা হয়ে গেছে শচীন্দ্রের। পত্রিকাটা সরিয়ে মিলিকে দেখে আর বলে, টেবিলে রেখে দে।
মিলি চায়ের কাপ সহ ট্রে-টা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখে। চায়ের কাপটা ছাড়াও মুড়ি ভাজা রাখা একটি বাটি রয়েছে ট্রে-র ওপর। রেখেই মিলি চলে যায়। শচীন্দ্র পত্রিকা পত্রিকা পড়তে পড়তে চা-মুড়ি খায়। ত্রিপুরায় চরম্পন্থীদের তৎপরতা, মণিপুরে সেনাবাহিনির গোলাগুলি, বিহারে দুই নিম্নবর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ, চিন-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা ---- এইসময়েই আবার ঘরের ভেতর ঢুকে মিলি শচীন্দ্রকে ডাকে, বাবা আরেকটু মুড়িভাজা দেবো ?
পত্রিকা পড়া থামিয়ে শচীন্দ্র মিলির দিকে চায়, না রে, আর খাবো না।
মিলির হাতেও চায়ের কাপ। সেও চা খাচ্ছে। চা খেতে খেতে মিলি আস্তে আস্তে বাবার পাশে এসে বসে। বাবাকে দেখে। বাবা আবার পত্রিকার মধ্যে ডুবে গেছে। ইস, কি রোগাই না হয়ে গেছে বাবা। সারা বছর ধরে পেট খারাপ। প্রায় সারাক্ষণই খিটখিটে মেজাজ। সংসারের নানা ঝামেলা। এসবের জন্যেই বোধহয় বাবার মাথার সামনের দিকের চুলগুলি একদম উঠে গেছে। অথচ আগে এমন ছিল না। সে যখন ছোট ছিল তখন বাবাকে কি সুন্দরই না দেখাতো। এক ঝলক হাসি যেন বাবার মুখে সবসময় লেগেই থাকতো তখন। অফিস থেকে ফিরে এসেই তাকে কোলে তুলে হেঁটে বেড়াতো। রাত্রে ঘুমোবার আগে কতরকম সুন্দর সুন্দর ভয়ংকর রূপকথার গল্প মেজদা, ছোড়দা আর তাকে বসিয়ে শোনাতো। বড়দা বয়সে একটু বড় বলে বই পড়ার ভান করে দূর থেকে কান পেতে চুপি চুপি শুনতো। সেসব দিনগুলি আজ কোথায় বুদবুদের মত মিলিয়ে গেছে। বড়দার কথা মনে এলে বুক ফেটে কান্না আসে মিলির। কয়েক বছর আগে প্রকাশ্য রাজপথে লোকজনের সামনেই বড়দা খুন হয়ে গেলো। তিনজন আততায়ীর ছোরার আঘাতে ছোরার আঘাতে বড়দার হৃদপিণ্ডটা ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। ওর একমাত্র অপরাধ --- অন্যায় জিনিসটাকে ও কোনদিন মানতে শেখেনি। কতোবার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। তারপর থেকে বাবাও কেমন জানি পালটে গেলো। মেজদা আর ছোড়দার জন্যে বাবার আরো দুঃখ এবং রাগ। আর্টস গ্র্যাজুয়েট হয়ে আজো বেকার মেজদা শুধু চাকুরির দরখাস্ত করে যায়, কারণ দেড়বছর পরই তার বয়স পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে যাবে। ফলে সে সরকারি চাকুরি আর পাবেনা, এমন কি কোন প্রাইভেট ফার্মে যে কোনদিন কাজ পাবে তাও আশা করা যায় না। এদিকে আজ একবছরের ওপর হলো মেজদা তার ভালোবাসার পাত্রীকে ঘরে এনে তুলেছে রেজিস্ট্রি বিয়ে করে এবং বৌদি এখন সাত মাসের গর্ভবতী। বাবা-মা অবশ্য এই বিয়েতে খুব একটা আপত্তি করেনি। শুধু বাবার মন্তব্য ছিলো, ‘আমার যতদিন চাকরি আছে ততদিন না হয় কোন চিন্তা নেই; কিন্তু এরপরের ব্যাপারটা যেন তোরা ভেবে রাখিস’।

মিলি বাবাকে ডাক দেয়, বাবা।
টিভি দেখতে আর ভাল লাগছে না শচীন্দ্রের। তাজা সব খবরগুলি পড়ার পর পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়ার জন্যে শচীন্দ্র যখন বিশেষ বিজ্ঞাপনের কলমগুলি খুঁজছে তখনই সে মিলির এই ডাকটা শুনতে পায়। পত্রিকার পাতা উলটাতে উলটাতে মিলির চোখাচোখি হতেই সে দেখে মিলি তার দিকে এক মমতা মাখা দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। তাই সে জিজ্ঞেস করে, কিরে, কিছু বলবি?
মিলি হাসে। বলে, তোমার ঘাড় টিপে দেবো বাবা ?
মিলি জানে, প্রায়সময়েই শচীন্দ্রের ঘাড়ে ব্যথা হয়। ব্যথা বেশি হলে আস্তে আস্তে সেটা মাথার দিকে চলে যায়। মিলি প্রায়ই ঘাড় টিপে দেয় বাবার।
শচীন্দ্র জবাব দেয়, দিবি টিপে ? আচ্ছা দে তাহলে।
চায়ের কাপ আর পত্রিকাটা টেবিলের ওপর রেখে শচীন্দ্র বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। মিলিও তার হাতের কাপটা টেবিলে রেখে বাবার ঘাড় টিপে দিতে আরম্ভ করে। বেশ আরাম লাগে শচীন্দ্রের। সত্যিই তার এই মেয়েটা তাকে সবসময়ই আরামে রাখতে চেষ্টা করে। খুব ভাল মেয়ে মিলি। সুখে ঘর করুক ও স্বামী-সংসার নিয়ে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওকে পাত্রস্থ করতে পারলো আর কই। কতো খোঁজাখুঁজি, পাত্রের বক্স নাম্বারে ঠিকানায় লেখালেখি ---- কোন কিছুই কাজে লাগে নি। মিলির বয়স আজ ত্রিশের কাছাকাছি। ছ বছর আগে কলা বিভাগে গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে চাকরির চেষ্টা করতে করতে ও এখন আবার শর্টহ্যাণ্ড শেখার স্কুলে ভর্তি হয়েছে। মিলির জন্যে একটা সৎপাত্র না পাওয়া পর্যন্ত বোধহয় তার মুক্তি নেই। মিলি যে তার বড় স্নেহের।
--- বাবা।
মিলির ডাকে শচীন্দ্রের চমক ভাঙে। শুয়োরের আওয়াজটা এখন আর শোনা যাচ্ছে না। শচীন্দ্র উত্তর দেয়, কি রে ?
মিলি বাবার ঘাড় টিপে দিতে দিতে বলে, আজ পুলিশ এসেছিল আমাদের বাড়ি।
--- পুলিশ ?
রাগ ধরে যায় শচীন্দ্রের। গত বছর দুই থেকেই পুলিশ আসছে তাদের বাড়ি। হারামজাদা নিমুটা কিসব করে বেড়াচ্ছে --- মারপিট, দাঙ্গাহাঙ্গামা। ছিনতাইবাজির কথাও মাঝে মাঝে শুনতে পেয়েছে সে। তার এই ছেলেটাই হয়েছে সবচেয়ে বখাটে, বেশ কয়েকবার পরীক্ষা দিয়েও স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেনি তাই অনেক বছর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে সে। কুসুমের ওপর রাগ ধরে যায় শচীন্দ্রের। ছেলেটাকে বেশি করে লাই দিয়েছে ওর মা-ই।

মিলি আবার বলে, ছোড়দাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
--- বেশ হয়েছে। ভালোই হয়েছে। আপদটা গেলেই বাঁচি।
একটা নিঃশ্বাস ফেলে শচীন্দ্র। আসলে ওগুলি তার রাগের কথা। কিন্তু ছেলে অন্ত প্রাণ কুসুম তো তাকে অন্যবারের মত কিছুই বলে নি এ ব্যাপারে আজ। মিলিকে সে জিজ্ঞেস করে, তো মা জানে ?
--- জানবেনা কেন। মা-ইতো তো দারোগাবাবুর কাছে কতো কাকুতিমিনতি করলো। কিছুক্ষণ থামে মিলি। তারপর আবার বলে, বিকেলবেলা ছোড়দা এসে বাড়িতেই খেয়েছে। ছেড়ে দিয়েছে বোধহয়।
ব্যাপারটা বুঝতে পারে শচীন্দ্র। নিমুকে ছাড়া হয়েছে দেখেই কুসুম এ ব্যাপারে তাকে কিছুই বলেনি, নইলে এতক্ষণ -- ।
মিলি এমন সময় ঘরের সুইচটা টিপে দেয়। আলো জ্বলে ওঠে। শচীন্দ্র জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়, চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসছে।
হঠাৎ শুয়োরটা আবার ঘ-র-র-র করে ডেকে ওঠে। শচীন্দ্র একটু চমকে যায়। ইতিমধ্যে সে শুয়োরটার কথা ভুলেই গিয়েছিলো।

পরদিন সকালে হেমেন্দ্রবাবুদের বাড়ির হৈ-হুল্লোড়-হাসির শব্দে শচীন্দ্রের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে সে দেখে ঘরে কেউ নেই। মিলি, কুসুম দুজনেই উঠে পড়েছে। বালিশের নিচ থেকে হাতঘড়িটা নিয়ে সে দেখে ছটা বেজে গেছে। উঠতে ভালো লাগে না তার। আবার চোখ বুজে পড়ে থাকে সে। তাছাড়া আজ ছুটির দিন। শুয়ে-শুয়েই সে মিলি আর বৌমার কথাবার্তা শুনতে পায়। কুসুম বোধহয় বাসন-টাসন মাজছে। দুই গুণধর ছেলের তো এইসময় বিছানা ছেড়ে ওঠার প্রশ্নই নেই।
আজ রোববার। আগামী সোমবার একটা বকেয়া ডিএ-র এরিয়ার বিল হবার কথা। কিছু টাকা তাতে হাতে আসার কথা। ধুস, অফিসের চিন্তা তার মাথায় বারবার এসে যায়। কতবার সে ঠিক করেছে অফিসের কোন চিন্তাই আর সে বাড়িতে এসে করবে না। কিন্তু বারবারই অফিস সংক্রান্ত চিন্তাই সে করে ফেলে। বারবারই ভুল হয়ে যাচ্ছে। এইসময় শচীন্দ্র টের পায়, ছট ছট আওয়াজ করতে করতে কে যেন ঘরে এসে ঢুকেছে। শচীন্দ্র চোখ খুলেই দেখে মিলি ঘরে ঝাট দিচ্ছে। শচীন্দ্র উঠে পড়ে।
চোখ-মুখ ধুয়ে শচীন্দ্র যখন চা খেতে খেতে বাজারে গিয়ে মাছ কিনবে কিনা চিন্তা করছে, তখনই শুয়োরটা ভীষণভাবে গুক গুক করে আওয়াজ করতে আরম্ভ করে। সকালবেলায় এই আওয়াজটা অসহ্য লাগে তার। তাড়াতাড়ি চা খেয়ে নেয়। তারপর বাজারের থলি হাতে বেরিয়ে পড়ে। পেছন থেকে কুসুম চেঁচায়, শাকসব্জি কিছুই নেই ঘরে। নুনও লাগবে।
রাস্তায় নেমে আসে শচীন্দ্র। শুয়োরটার গু-ক গু-ক আওয়াজটা আরো বাড়তে থাকে। এই আওয়াজের সঙ্গে কিছু লোকের মিলিত একটা হৈচৈও কানে আসে। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় শচীন্দ্র কৌতূহলবশত হেমেন্দ্রবাবুদের বাড়ির দিকে লক্ষ করতেই সে দেখে দুজন লোক একটা খুঁটির সঙ্গে পেটে শেকল দিয়ে বাঁধা একটা শুয়োরের পাগুলি বেঁধে ফেলবার জন্যে খুব চেষ্টা করছে হৈচৈ করতে করতে। আশ্চর্য, শুয়োরটা তার পাগুলিকে বেঁধে ফেলতে একদম দিচ্ছেনা। ফলে লোক দুজন বাঁধতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। শুয়োরটা খুঁটিটাকে কেন্দ্র করে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে। শচীন্দ্র দাঁড়িয়ে যায়। ব্যাপারটা দেখতে থাকে। লোক দুজনের একজন মাথা নুয়ে মুখে আঃ আঃ শব্দ করে শুয়োরটা পেছনের পা দুটোর উদ্দেশ্যে দড়ি ঢুকিয়ে দিতেই শুয়োরটা লাফ মেরে সরে যাচ্ছে। আবার অন্য লোকটাও একই চেষ্টা করে। শুয়োরটা আবার লাফ মেরে বেরিয়ে যায়। সঙ্গে সমানে শুয়োরটা আওয়াজ করতে থাকে গু-ক গু-ক গু-ক। শচীন্দ্র মনে মনে তারিফ করে, বাঃ শুয়োরের মাথায় দেখি বেশ বুদ্ধি!
বারবার ব্যর্থ হবার পর লোক দুটোর একজন কোত্থেকে একটা লোহার ডাণ্ডা সংগ্রহ করে আনে। এনেই লোকটা লোহার ডাণ্ডাটা দিয়ে জোরে শুয়োরটার মাথায় এক ঘা বসিয়ে দেয়। শুয়োরটা আর্তনাদ করে ওঠে। ব্যাপারটা এবার শচীন্দ্রের বেশ খারাপ লাগে। কোথায় যেন একটা মৃদু যন্ত্রণা হয়। একটা নিরীহ জন্তুকে বাঁধা অবস্থায় এভাবে আঘাত ! ছিঃ! শুয়োরটা তবু তার পাগুলিকে বেঁধে ফেলতে দেয় না। লোকটা তখন শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে শুয়োরটায় মাথায় পরপর লোহার ডাণ্ডা বসাতে থাকে। আর বাঁচার জন্যে শুয়োরটা তীব্র আর্তনাদ করতে করতে খুঁটিটার এদিক ওদিক দৌড়োতে থাকে। শুয়োরটার জন্যে শচীন্দ্রের খুব কষ্ট হতে থাকে। আহা একটা অবুঝ জন্তুর ওপর এইরকম অত্যাচার ! উঃ। ডাণ্ডার আঘাতের প্রতিধ্বনি যেন তার মাথায় একটা অনুরণন তুলতে থাকে।
কিছক্ষণের মধ্যেই শুয়োরটার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। আস্তে আস্তে শুয়োরটার দৌড়াদৌড়ি এবং আর্তনাদের ক্ষমতা কমে যেতে থাকে। একসময় আর শুয়োরটার পালিয়ে যাবার ক্ষমতা থাকে না। রক্তাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। আর মার খেতে থাকে। শচীন্দ্রের আর দেখার ইচ্ছে হয় না। শরীরটা যেন কেমন একটা দুর্বল অনুভব করতে থাকে। এইসময়েই সে দেখে লোক দুজন চটপট শুয়োরটাকে বেঁধে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। তারপরেই লোক দুজনের একজন ঘরের দিকে মুখ করে চিৎকার করে, কিরে হলো নাকি ? চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে তৃতীয় আরেকজন লোক ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে। লোকটার হাতে কাঠের হাতলওয়ালা আগুনে তপ্ত টকটকে লাল একটা লোহার শলাকা। লোকটা দৌড়োতে দৌড়োতে এসে মাটিতে শোয়ানো শুয়োরটার হৃৎপিণ্ডে ভুঁস করে ঢুকিয়ে দেয়। শুয়োরটা আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে আর্তনাদ করতে থাকে। পা-গুলি ছুঁড়তে থাকে। শচীন্দ্রের হাত থেকে বাজারের থলিটা নিচে পড়ে যায়। একটা কেমন যন্ত্রণায় সে দু হাতে তার হৃৎপিণ্ডটা চেপে ধরে আর দেখে দোতলার ওপর থেকে হেমেন্দ্রবাবুরা শুয়োর মারা দেখছেন। শুয়োরটার আর্তনাদ যেন সবকিছুকে কাঁপিয়ে দিতে থাকে। বুকটা চেপে শচীন্দ্র রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে টলতে থাকে।
                                                                                                  
                                                                                                       HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন