গল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন হেমন্ত সংখ্যা নভেম্বর ২০১৬ ইং 

আত্মহত্যার আগে ও পরে
অনুপ ভট্টাচার্য

এক

ছেলেটি ভাবল, আমাকে নিপুণভাবে অভিনয় করতে হবে। সবাই তো পছন্দমতো এক একটা চরিত্রে অভিনয় করে সমাজে দিব্যি সাড়া ফেলে দিচ্ছে। ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করার মুহূর্তেও সে কিছু এরকমটা ভাবেনি।
পাশ করার পর চাকরির জন্যে তাকে বিভিন্ন শহরে ছুটতে হয়েছিল। শেষ নীট ফল মিলেছিল জিরো। তবে ছেলেটির মধ্যে এমন একটা স্মার্টনেস ছিল, তাকে বেকার বলে মনেই হত না। কাছেপিঠে যারাই চাকরি পেয়ে গেছিল, তাদের নিত্যদিনের আড্ডাকে সে নানান টেকনিকে জমিয়ে রাখত। তাকে দেখে তাজ্জব বনে যেত সবাই। বেকারত্বের কোন গ্লানি বা বেদনা --- কেউ ছেলেটির মধ্যে খুঁজে পেত না কোনদিন। তার ধোপদুরস্ত পোশাকআশাকে, ক্লিন শেভ আর দামি সিগারেটের প্যাক নিয়ে ঘুরে বেড়ানোয় --- সবাই সহজেই তাকে বিশ্বাস করে ফেলল।

দুই

একদিন ছেলেটি একটি চা বাগানের ম্যানেজার পোস্টের জন্য ইন্টারভিউর ডাক পেল। সে তখন সবাইকে বলতে শুরু করল, আমি আসলে কোলাহল পছন্দ করি না। চা বাগানের নির্জনতা আমার বড় প্রিয়। আমি বোধহয় চা বাগানের ম্যানেজার হবার জন্যেই জন্মেছি।
এরপর থেকেই আড্ডায় হৈচৈ করতে করতে সে মাঝে মাঝে কিরকম আনমনা হয়ে যায়। আড্ডাপ্রিয় ছেলেটি একেকদিন এমন গুম মেরে থাকে, মনে হয় --- সে সেদিন তর্ক ও বাক্-বিতণ্ডার মধ্যে থেকেও যেন নেই। তার নাকের ফুটো দুটো বেশ বড় হয়ে যায়। ঘন ঘন শ্বাস পড়ে। চোখের চাউনি দূরমনস্ক হয়ে পড়ে। কপালে বেশ কয়েকটা চিন্তার রেখা ভেসে ওঠে। পোড়া সিগারেটের টুকরোয় অ্যাশট্রেটা ভরে যায়। কেউ তখন তাকে জ্বালাতন করে না। সবাই ভাবে এই মুহূর্তে সে নির্জনতা খুব বেশি পছন্দ করছে। তখন এভাবেই মাঝে মাঝে বিজন সময়ের কাছে চলে যায় সে। রোদজ্বলা দুপুর, শিশির পড়ার শব্দ বা আকস্মিক নেমে আসা সন্ধ্যা ছেলেটির খেয়াল ছুঁয়ে যায় না। কেউ কেউ ভাবে, এই সব মুহূর্তে কোনও সুন্দরী যুবতী তার মনের দখল কেড়ে নেয়। তার সঙ্গ অনুষঙ্গ ছেলেটি অদৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। তাকে লক্ষ্য করে সবাই তখন ফিসফিসিয়ে কথা বলে। তার এই জেগে ঘুমানোর অভ্যাস একান্ত কাছের মানুষটিকেও ব্যাঘাত ঘটায় না। অথচ কৌশলগত কারণে ছেলেটি এসব অভিনয় দিনের পর দিন চালিয়েই যায়। নির্জনতাপ্রিয় আখ্যায় আখ্যায়িত হতে চেয়েই এসব তার গোপন চাতুরী।

তিন

এর মাঝেই, দেখতে দেখতে একদিন চা বাগানের ম্যানেজারের ইন্টারভিউর দিন এসে গেল। ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে হাজির হতেই সে আরো স্মার্ট হয়ে গেল নিমেষেই। পোশাকআশাকেও তাকে বেশ উঁচু দরের অভিজাত বলেই মনে হচ্ছে। সে এখন এরকম ভাবতে শুরু করেছে --- একদল লোক সুযোগ পেয়ে নানারকম প্রশ্ন করে রেগিং করবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। ঠিক অনুরূপভাবে ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়ার পরে পরেই উপরের ক্লাসের ছেলেরা তাকে নগ্ন করে নানারকম কুকর্মে ব্যস্ত করে ছেড়েছিল। অবশ্য সেই হার্ডলবার ছেলেটি সাসসিকতার সঙ্গে অতিক্রম করে এসেছে।
ইন্টারভিউ বোর্ড ছেলেটকে জিজ্ঞেস করল প্রথমেই --- তুমি অবসর সময় কাটাও কিভাবে ?
ছেলেটি চটপট উত্তর দিল, টেনিস খেলে, বিলিয়ার্ড খেলে, ছবি এঁকে। কখনোসখনো মদ খেয়ে।
--- চমৎকার চমৎকার।
চোখে চশমা, গলায় টাই, পাকা জুলফি এবার ভারিক্কি ভরাট গলায় জিজ্ঞেস করল, তুমি তো আজন্ম শহরের ছেলে, চা বাগানের নির্জনতায় নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবে তো ? কাজের বাইরে তোমাকে তো অন্য কোনো পরিবেশে মেলামেশা করা চলবে না। সে আন্তরিক গলায় জবাব দিল, ছবি আঁকা আর মদ্যপানের জন্যে নির্জনতাই বড্ড বেশি জরুরি। এবং আমার প্রথম পছন্দ।
বোর্ড মেম্বাররা একবাক্যে বলে উঠল, সাবাস। এরকম লোককেই আমাদের ম্যানেজমেন্টের খুবই প্রয়োজন।
সে এবার স্মার্টলি জিজ্ঞেস করল,আপনাদের কি আর কোনো কোশ্চেন আছে ? সমস্বরে বোর্ড মেম্বাররা বলে উঠল, না। আমাদের যা প্রয়োজন আমরা জেনে ফেলেছি। সাতদিনের মধ্যে ইন্টারভিউর ফল তুমি জেনে যেতে পারবে। তৈরী থেকো—
সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছেলেটি ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বেরিয়ে এল। আসতে আসতে ভাবল, সত্যি সে আজ বেশ ভাল অভিনয় করতে পেরেছে। বোর্ডের সামনে সে আজ যা যা করতে পারে বলে স্বীকারোক্তি দিয়ে এসেছে, এর একটিতেও সে জীবনে সময় ব্যয় করে নি। তবে সে জানে চা বাগানের ম্যানেজার কিভাবে নিজস্ব সময়কে হত্যা করে এবং এও বুঝতে পেরেছে অনেক ইন্টারভিউতে সতর্কভাবে শক্ত শক্ত প্রশ্নের জবাব দিয়েও চাকরিটা ভাগ্য ফসকে অন্যের হাতে চলে গেছে। তার আগেও সবই জানা ছিল, একমাত্র অভিনয়টুকু নয়। এবার তার চাকরিটা না হয়ে যায় না। মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠে সে। নিপুণ অভিনয়ে খুশি খুশি ভাবটা লুকিয়েও ফেলল আবার। চঞ্চল বালকের মতো রাস্তা থেকে পাথরের একটা টুকরো তুলে নিয়ে ফুটবলে লাথি মারার মত পা দিয়ে শট্ মেরে ফেলে দিল দূরে।

চার

সাতদিনের মাথাতেই ছেলেটার চাকরি হয়ে গেল। চাকরি হতে না হতে যেন বয়স্ক হয়ে গেল সে। দিব্যি এক রাশভারি স্বভাবের ভদ্রলোক। দায়িত্ববান, সম্ভ্রান্ত। কর্মদক্ষ।
এখনও সে সজ্ঞানে নির্জনতাপ্রিয় নিপুণ অভিনয় করে চলে। কখনো বা ঘন্টার পর ঘন্টা নির্জনতার দিকে চেয়ে থাকে। কখনো বা মদ খেয়ে নির্জনতায় সত্যি সত্যি একা একা মাতাল হয়ে যায়।
তখনই ছোটবেলাকার কথা বেশি বেশি মনে পড়ে। বৃষ্টির দিনে কাদা মেখে ফুটবল খেলা, ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরঘাটে ঘন্টার পর ঘন্টা দাপাদাপি করে সাঁতার কাটা। কালবৈশাখীতে ঝড় মাথায় করে আম কুড়ানোর কথা। সবই একে একে তার মনে পড়ে। বিশেষত মায়ের কথা মনে পড়ে, তার ভীষণ কষ্ট হয়। চাকরি পাওয়ার তিন মাসের মাথায় মা মারা যায়। মায়ের চেহারাটা আজকাল ভুলে যাচ্ছে কি ? ভীষণ ভয় হয় তার। চেহারাটা মনে মনে ধরে রাখতে চেষ্টা করে। বেশিক্ষণ যেন পারেনা। ক্রমাগত দিনযাপন হয় তার নিরালায়। নিরালাই কোন কোন সময় শহরের বন্ধুদের স্মৃতি সামনে টেনে আনে। এলে খুব কষ্ট হয়। সে বহুদিন ধরে পাহাড়ের বেড়াজালে বড় বেশি কষ্ট পায়। ষাট মাস চাকরি জীবনে মাত্র তিন দিন শহরে গিয়ে তার বন্ধুদের সাথে দামি হোটেলে আড্ডা মেরে মদ খেয়ে রাত্রিযাপন করে এসেছে।
পাক্কা পনেরো বছর এভাবে দিনরাত্রি অভিনয় করতে করতে সে অভিনয়ে পুরোদস্তুর দক্ষ হয়ে গেল। এই দক্ষতাই তাকে আমূল বদলে দিল। শহুরে কেতাদুরস্ত ছেলেটি এখন একদম ভিন্ন প্রকৃতির। সে এখন সত্যি সত্যিই নির্জনতাপ্রিয় এক প্রকৃতিপ্রেমিক।
পঁচিশ বছর নির্জনতায় কাটিয়ে লোকটি একদিন অস্বাভাবিকভাবে মারা গেল। সবাই বলল, প্রকৃতি সত্যি সত্যি একজন নির্জনতাপ্রিয় প্রেমিককে হারাল।

পাঁচ

তার চাকরি পাওয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের শেষে সে ভীষণভাবে লোকালয়ে আসার তাড়া অনুভব করেছিল। হন্যে হয়ে শহরে চাকরির খোঁজও করেছিল। শেষ অব্দি হয়নি। হয়-ই নি।
আসলে সময়ের সঙ্গে সময় মেপে কোনোদিনই স্মার্ট হতে পারেনি ছেলেটা।                                                                                                                 
                                                                                                   HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন