গল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন হেমন্ত সংখ্যা নভেম্বর ২০১৬ ইং 

স্থাণু 
দুলাল ঘোষ 

একটা ছবি তুলে রাখো।
বন্ধ জানালার বাইরে বুড়ো শিউলি ফুলের গাছে, এক এক করে শেষ তিনটে সবুজ পাতার দু’টোই খসে পড়ছে যখন, ঘরের ভেতর বাতাস এক মহাশূন্যের নিচে, পায়ের নিচে মাটি না-পেয়ে শূন্যস্থিতি বুকে শুধু হৃৎপিণ্ড শব্দ করে। রক্ত ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হয়, এখন তক্তাপোষে কেবল শুয়ে থাকা—
একটা লাশ। বাইরে ভেতরে একই শব্দ শোনে --- শামুক ঠুকরে ঠুকরে খায় কয়টা পাখি। নিঃশ্বাসের গন্ধে মনে পড়ে মন্বন্তরের দিনে বদ্ধ-গোয়াল ঘরে পচে-গলে মরেছিলো বোধনী। এখনো মাটি স্পর্শ করে আছে কংকালসার, শূন্যদৃষ্টিতে শতশ্ছিদ্রে শরীরে সূর্যালোক ঢুকে যায়, আরোগ্যলাভের চেষ্টা করে সে, নিজের ছায়া দেখে নি কতোদিন তার মনে পড়ে।
--- এই লোকটার অবসাদ নিয়ে শিল্প গড়ে বহুরূপী। তীর্থংকরের চালচিত্র দেখায়, তীর্থংকর পাগল।
কতোটুকু পাগল হলে মুখ গড়িয়ে লালা ঝরে, পেটটা পিঠের সাথে একাকার হয়ে যায়। দীর্ঘ চুলদাড়িতে আবৃত চোখ। হায়নার মতো পলক পড়ে না। দীর্ঘকাল এই ঘরে শুয়ে আছে, লোকটা আসলে কে ?
নাটকের কোন চরিত্র হতে পারে ? তাহলে মঞ্চশয্যা হবে এই রকমঃ চোখ খুলে নড়বড়ে ঘর, চোখ বুজে অন্ধকারের শরীর ছিঁড়ে খুবলে পচা-গলা মাংসের মতো ইতিহাস জাবর কাটে। দীর্ঘকাল তক্তাপোষে শুয়ে শুয়েই একের পর এক আঁচড় কাটে মাটিতে। এক গাদা কেঁচো ঘরময় কিলবিল করে। ঘরময় ব্যাঙের রাজত্ব। এবং তেল চিটচিটে একটা সাপ তক্তাপোষ বেয়ে শুয়ে থাকা পুরুষটার যৌনাঙ্গ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় এখন। বাড়ি-রাখাল লোকটা দীর্ঘদিন একই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকে।
বন্ধ দরজার বাইরে চৌকাঠে গা ঘেঁষে থাকে সড়াল্যা লালুও – ভক্ত লালমোহন বুড়ো হয়ে গেছে। ঘরের ভেতর থেকে শব্দ শুনে মাঝে মাঝে পিচুটি জড়ানো চোখ খুলতে চেষ্টা করে, কষ্ট হয়, একবার লেজ নাড়ে,আবার একই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকে।
সে ভাবতে থাকে, একদিন ‘চরৈবেতি চরৈবতি’ করে, আজ কেন মাটি ছুঁয়ে শুধু শুয়ে থাকা! প্রহর গোণা কেবল। ঘুম আসে না, উলটো সংখ্যা গুণে গুণে ক্রমান্বয়ে শূন্য যখন, স্মৃতি আসে।
কাঠের লাল-চুষণীটা চুষে চুষে, নীল মশারীর নিচে শুয়ে কেবল মশারী মশারী। ধাঁধার মাঝে ডানা-মেলা পরীর মুখ রামধনু রং ঝুনঝুনি লম্বালম্বি দোলনা দুলতো। ক্ষুধা লাগতো ক্ষুধা। চোখের কোণে জল গড়িয়ে জিহ্বায় লবণাক্ত স্বাদ লাগতো তখন – সোনা, সোনা আমার, ক্ষিদে পেয়েছে নাকি তোর! চাঁদ মুখটা শুকিয়ে গেছে বলে, জোর জবরদস্তিতে স্তনের বোঁটা মুখে পুরে দিলেই অস্বস্তি! হাত ছুঁড়ে পা ছুঁড়েও নিস্তার নেই – যতোক্ষণ না অবসাদ, আহা ঘুম! ঘুমের মাঝেও লাল-চুষণী আর পরীর মুখ ঝুনঝুনি লম্বালম্বি দোলনা দোলতো।
যে পেন্ডুলাম ঘড়িটা ঘরের দক্ষিণ দিকের পালায় দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিলো, দমবন্ধ, তারে দিন দুই আগে আধল ইট ছুঁড়ে ভেঙে ফেলেছে সে, অনর্থক যতো যন্ত্রপাতি। ভাঙা কাঁচে ডান হাতের তর্জনী কেটে গেছে অর্দ্ধেকটা, আঙুল চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ে। চোখ বুজে সে বুঝতে পারে এক দুই করে এমনি আপন শরীর ছেড়ে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যাওয়া একদিন।
কোথায় যাওয়া ? সেখানেও কি এমনি দেয়াল ঘড়ি আছে ? দমবন্ধ ? জানালার বাইরে শিউলি ফুলের গাছে আজো একটি পাতা অবশিষ্ট আছে ভেবে আশ্বস্ত হয় সে। স্মৃতি হাতড়ায়।
একের পর এক আঁচড় কাটে মাটিতে। কান পেতে শোনে --- একটা শামুক ঠুকরে ঠুকরে খায় কয়টা পাখি, চেঁচামেচি করে—
তীর্থংকর……… তীর্থংকর………
নিজেকে আরো গুটিয়ে নেয়! তবু খোলস ভাঙতে থাকে। শামুকের মজ্জা ও মেধা ঠুকরে ঠুকরে খায় ………
একটা কাক একদিন গুলতি ছুঁড়ে মেরে ফেলেছিলো অনঙ্গ। অবশেষে অনঙ্গের কাছেই যাবে সে। বলবে, আমিও পালাইনি রে, আসলে বুড়িছুঁই খেলছিলাম নিজের সাথেই। কিছু কথা কাটাকাটি, ছবি আঁকিবুকি। যেমন, ভাঙা পেন্ডুলাম ঘড়ি ঘরে ঝুলতে থাকে বা একটা সাপ একজন পুরুষের যৌনাঙ্গ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় এমন।

দুই

তীর্থংকর, এইরকম ছবি তুলে মুছে ফেলে, তুমিও কি মনের ছবি তুলতে পারো ? কী চেয়েছিলে ?
একটা ঘর। ঘরে সোনামুখী সূচে আনন্দময়ী মা যদি নক্সিকাঁথা বুনতো! একজন অরুণকান্ত প্রাতঃকালীন প্রাণায়াম সেরে ঘুম ভাঙাতো --- তীর্থ, তীর্থ উঠো, প্রভাত-ফেরী যায় দেখো!
তুমি ছিলে কবি! অস্বীকার করেছিলে এপর্যন্ত জীবনের যত পচাগলা তত্ত্ব। ঘটনায় অঘটনে জীবন নয়। বলেছিলে,অনুভবে অনুভবে। লিখেছিলে, এতো দুঃখ যে কোন স্মৃতি নয়, কবিতা উচ্চারণের মতো জীবন এতো দুঃখ যে, সামান্য দীর্ঘশ্বাসেও একটা গল্প হয়! এতো দুঃখ যে কোন স্বপ্ন নয়, স্মৃতি নয় এখন, সন্তর্পণে সন্তরণে ব্যস্ত আছি --- কোন দুঃখ নয়।
তাহলে সুখ ? কী সুখের আশায় মন তুই গৃহীও না বাউলও না। একা একা বিচরণভূমে তীর্থংকর, তুমি একজন গৃহী ছিলে। সড়াল্যা লালুটা উপোস কাটাবে বলে ফিরে গেছে। ঘরের দাওয়ায়, ল্যাজ নাড়ে লালমোহন। তবু তোমার বুকে অনবরত বইতে থাকে --- ফেলে আসা শ্মশান ঘাটের কাছে ছোট্ট নদী, তার বুকে ঢেউ, রাতে পূর্ণ চাঁদও ভাঙতে থাকে। আর তুমি একা একা ---
ঘরে, তক্তাপোষে শুয়ে শুয়ে এখন কী ভাবছো ? ক্ষুধা ? রান্নাঘরের বেড়াল তোমার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিলো ? ঘর তছনছ করেছিলো ? তোমার শরীরে শরীর ঘেঁষে আজও অনবরত ডেকে যায় দেখো ক্ষুধা। তুমি তারে কী শাস্তি দিতে পারো ? কোন ছবি তুলে রাখতে পারো ?
পারো না। এখন কিছুই পারো না তীর্থংকর! শত চেষ্টা করেও হাতটাকে মুষ্টিবদ্ধ করতে পারো না। তক্তাপোষে কেবল শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকো---
অনঙ্গ জানে না, প্রতিবার বীর্যপাতে কতশত মৃত্যু হয়! উল্কাপাতের মতো এই জন্ম, জীবন তুমি যাবে কোথায় ? নিশ্চিত গন্তব্যের কথা বলতে পারে একমাত্র তীর্থংকর, এখন একা একা –
তবু এই ঘরে রোজদিন তেত্রিশকোটি দেবতার পুতুল গড়ে সে, কার জন্যে ? একটাও ভাঙতে পারে না। আত্মহত্যা করতে পারে না তীর্থংকরের জন্যই। আরোগ্য চায়, বিপদভঞ্জন মধুসূদনের পুতুল বানায়!
আসলে পাগল হয়ে যায় সে উনিশ বছরের জন্মলগ্ন থেকেই! ফেরা রথের মেলায় বেলালী তার হাত ধরে নিয়ে যায়। বেলালী ষোল। কার্পাস তলায় মেলা বসেছিলো। কৃষ্ণনগরের পুতুল কতো সোহাগি ভাবতে থাকলে, অন্তঃসত্ত্বা বেলালী তার হাত ধরে নিয়ে যায় দূরে শহরপ্রান্তে।তিন কোনার মোকামে কালীফকিরার ঘরে সে ঢুকে গেলেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ জানালা, দরজা, বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে বিষপান করে বেলালী। বিবস্ত্রা হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকে, রক্তক্ষরণ হয় --- শাপমোচন। অনেক পরে, দরজা খুলে বেরিয়ে আসে যখন, একগাল হেসে বলেছিলো--- মেঘ কেটে গেছে।

তিন

এইসব দৈহিক না জৈবিক সুধা ? আমারে পাগল করে আসলে খড়কুটো, খুঁজে খুঁজে পাখির চঞ্চু থেকে যাবতীয় আকাঙ্ক্ষা খসে পড়ে যায় সমুদ্রে, প্রতিবিম্ব দেখে অবশেষে ঝাঁপ দিলে --- চড়ুইভাতি করে মাছেরা, নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটে। পিতৃপক্ষেও জলে কোনদিন তর্পণ করিনি, কারণ প্রতিবার বীর্যপাতে কতশত মৃত্যুর মাঝে এই জন্মেও শুধু একা একা – মরণের চিন্তা এবং আমারই নাভি থেকে জন্ম নিলো যে বেড়াল, রান্নাঘর তছনছ করে প্রদেশজুড়ে একা একা ডেকে যায়, অবশেষে যৌনাঙ্গ ছুঁয়ে থাকে --- কেন বেঁচে আছি ?
একটিমাত্র কবিতার জন্য ? যৌনরোগ নিঃসঙ্গ করে শুধু, একলা করে ছাড়ে। গেরস্থালি ভেতরেও চার দেয়ালের ঘর করে একা একা। দর্শকের ভূমিকায় অবশেষে কত একলা হয়ে যাওয়া অনঙ্গ জানে না! আমার এই একাকীত্বরে সম্ভ্রম করে যায় শালারাই পঙ্গু করেছে আমারে—
বিকর্ষণ করেছে বেলালী। সে চলে গেলে বুকে মেঘ জমেছিলো কয়দিন ? জাহাজ কোম্পানীর কর্মচারি আমার বাবা একদিন বেকার হয়ে গেলে নেশা ধরেছিলো, আতরের গন্ধ নিয়ে ফিরতো গভীর রাতে। আমারই জন্যে মায়ের সময় নষ্ট হয়ে যেতো – এই চিন্তায় কতটুকু দুঃখ আছে ? একজন নাবালিকারে নারীত্বের মর্যাদা দিয়ে কেউ পাগল হয়ে যায় আমি বিশ্বাস করি না। আর একজন বন্ধুর চোখ থেকে সেই ফুল পাখি আর জোনাকির রহস্য জেনে, তিলে তিলে তারে হত্যা করেও আমি পাগল নই। --- এই আমি, অন্যরূপে তীর্থংকরের ছবি তুলে রাখো।

চার

এই রকম অসংলগ্ন চিন্তা। চিন্তার ভেতরে চিন্তায়, দ্বন্দ্বে তীর্থংকর পাগল হয়ে যায়।
একলা শুয়ে বসে এখন কী করে ? উঠে বসে তক্তপোষে। সর্পিল শির শির করে শরীর। সূর্যালোক বাঁচিয়ে হাঁপায়। তক্তাপোষে বসে বসেই ভাবতে থাকে দালানকোঠা, বাইরে বারান্দা, ফুলের বাগান অঙ্গনে। ভেতরে বিছানা থাকবে একটা, জলের কুঁজো, সে আর বেলালী। বেলালী ? নিশ্চয়ই বেলালী। ভাবতে ভাবতে একা তীর্থংকর, তীর্থংকর একা একা –
দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। পায়ে পায়ে দক্ষিণের জানালা খুলে দেখে গ্রীষ্মের নদী। তীরে বসে তীর্থংকর বড়শি বায়। তার অজান্তেই এখন জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিঃশব্দে সাঁতার কাটে ডুবুরি। সেই যে সন্তর্পণে সন্তরণে ব্যস্ত থাকা --- একটা সুস্থ কবিতার জন্যে, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যে, তীর্থংকরের জন্যেই বড়ো মাছ খুঁজে বেড়ায় সে।
এবং কিছুই না পেয়ে একসময় মরণের চিন্তায় পাগল হয়ে যায় তীর্থংকর। কবে সেই ছেলেবেলায় গয়লাবাড়ির পাগল কুত্তাটা কামড়ে ছিলো, এখনো গা শির শির করে। অস্থির অস্থির করে ঘেমে উঠে শরীর। তীর্থংকর জলের কাছে দৌড়ে যায়, স্পর্শ করে, আকণ্ঠ পান করে লক্ষ্য করে আতংক। এবং এইভাবে একসময় পাগল হয়ে যায় সে, বন্ধ দরজাটা হাট খুলে ধরে –
আলো আর বাতাস হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ঘরে। সব এলোমেলো করে দেয়। ভাঙা পাতিলের তলানিতে এক মুষ্টি চাল নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে দেয় তেলাপোকা। মশামাছি ওড়াওড়ি করে হা-মুখে আর বুকে। বাতাস আর বাতাস! রক্ত চলাচল দ্রুততর হলে, এখন আমার কোন অসুখ নেই বলে, যতোবারই উঠে দাঁড়াতে গেছি – ছুঁইতে পারে না, ছুঁইতে পারে না করে বুড়িছুঁই খেলে কারা ?                                                                                                                                                                           HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন