best web design software for mac
বিশ্বদীপ দে          
একটি অবাঞ্ছিত দৃশ্যের জন্ম


গল্প           Home


ঐ যে লোকটা, লোহালক্কড়ের মাঝে বসে, ঐ যে, দশাসই চেহারা, সমস্ত শরীর জুড়ে চুঁইয়ে নামছে ঘাম, ঝাঁকড়া চুল, হলদেটে চোখ, মুখময় চিবোতে থাকা পানমশলার সুবাস, সমস্ত মন নিয়োগ করে রেখেছে খুলে রাখা টিউবঅয়েলের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিকে, ওর নাম নিবারণ মন্ডল। আর, সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঐ যে মেয়েটি, মসৃণ সযত্নলালিত গম রঙের ত্বক, উজ্জ্বল চোখ, একমাথা কোঁকড়া চুল, হলুদ ফ্রক পরা মেয়েটি, ওর নাম সম্পৃক্তা চ্যাটার্জি। ডাকনাম মুনিয়া। কলকাতার এক নামী দামী স্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্রী। আজই বেড়াতে এসেছে এখানে। এই অজ পাড়াগাঁয়ে। মেয়েটি জানেও না আর আধঘন্টা বাদেই তাকে ধর্ষণ করে খুন করবে ঐ লোকটা। ভাসিয়ে দেবে একটু দূরে বয়ে চলা কালো খালের জলে। লোকটাও কি জানে, অবশিষ্ট জীবন জুড়ে একদিনের জন্যও সে ভুলতে পারবে না ঐ সদ্য কিশোরীর মুখচ্ছবি। অবশ্য জানবেই বা কী করে! ভবিষ্যৎ, আমাদের সকলের ভবিষ্যৎই তো লুকোনো আছে এক অজানা খোঁদলের অন্ধকার আর্বতে। কেমন করে তার খোঁজ আগেভাগে পেতে পারি আমরা ? সুদূর মহাকাশের বুকে যে ঘটনা ঘটবে তার অগ্রিম পূর্বাভাস করতে পারেন বিজ্ঞানীরা। ঘটনা ঘটবার বহু আগেই ঘটনার সময় – সন, তারিখ এমনকি পল, অনুপল অবধি বলে দিতে পারেন তাঁরা। কিন্তু সামান্য নশ্বর মানুষের জীবনে কবে কোথায় কী অঘটন ঘটবে তা তাঁরা বলতে পারেন কই ? আমাদের ভবিষ্যৎ তাই এক অজানা কৌটোর মধ্যে সবসময় হেসে চলেছে এক তীব্র, কুটিল ব্যাঙ্গের হাসি।
এখনও নিবারণ লক্ষ্যই করেনি মেয়েটিকে। একমনে টিউবঅয়েল সারাইয়ে ব্যস্ত নিবারণ হাত দিল লুঙ্গির কোঁচড়ে। বের করে আনল বিড়ির প্যাকেট। বিড়ি ধরিয়ে সুখটান দিতে গিয়ে এবার তার নজর পড়ল মেয়েটির দিকে। এই মেঘলা, নির্জন দুপুরে, আশেপাশে কেউ নেই, শুধু সে আর একটি কিশোরী – এ কথা ভাবতে নিবারণের ভাল লাগল। ব্যাস্‌। এর বেশি কিছু না। নিবারণ আবার মন দিল কাজে। অথচ মাত্র আধঘন্টা বাদেই সে ঐ মেয়েটিকে নিয়ে যাবে পাশের বাঁশঝাড়ে। মুহূর্তের ক্ষিপ্রতায় গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলবে মেয়েটির মুখ। ততক্ষণে মেয়েটি জ্ঞান হারিয়েছে চোখের সামনে এক মত্ত দানবকে দেখে। মেয়েটির বুকের আড়াল ছিন্ন করতেই নিবারণ দেখতে পাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে এক ঝাঁক হলুদ প্রজাপতি। মুহূর্তে প্রায়-উন্মাদ অবস্থা থেকে পূর্ণ উন্মাদে পরিণত হবে নিবারণ। তার সমস্ত শরীর জুড়ে গজিয়ে উঠবে বিশ্রী, ধূসর লোম। ধীরে ধীরে লম্বা হয়ে উঠবে কান। দীর্ঘ হয়ে উঠবে দাঁত ও নখ। হরর সিনেমার মতন চোখের পলকে সে হয়ে যাবে একটি মানুষ নেকড়ে। এবং তাড়া করবে ঐ প্রজাপতির ঝাঁককে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রাস করেও ফেলবে সব ক’টি হলুদ, কোমল, বর্ণাঢ্য প্রজাপতিকে। আর নিজের তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত দিয়ে কুটিপাটি করে নিজের লালারসের সাথে মেখে, থেঁতলে, চটকে, পিষে অন্তস্থ করেও ফেলবে দ্রুত। তারপর একসময় ভোজনশেষে নিজেকে আবিষ্কার করবে একা, উলঙ্গ অবস্থায়, অসহায় মৃতা এক কিশোরীর পাশে, বাঁশঝাড়ে। কিন্তু সে ঘটনার দেরী আছে। এখনও আধঘন্টা। এখনও নিবারণের মধ্যে অঘোরে ঘুমোচ্ছে সেই হিংস্র শ্বাপদ। তার ঘুম ভাঙতে এখনো দেরী আছে।
গত দু’দিন ধরে টানা বৃষ্টি হয়ে আজ সকাল থেকে থেমেছে। একেবারে যে থেমেছে তা নয়। মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। ঝিরঝির করে। অবশ্য এখন হচ্ছে না। কিন্তু সমস্ত আকাশ জুড়ে ভারী মেঘ। সেই মেঘভারে চারপাশ কেমন ময়লা, আবছা বর্ণ ধারণ করেছে।
বিড়িটা ভাল করে ধরেনি। নিভে গেল। নিবারণ বিরক্ত হয়ে দেশলাই বার করল। কিন্তু সেটার অবস্থা খুবই খারাপ। আগের বারে অনেক কষ্টে সে আগুন জ্বালাতে সমর্থ হয়েছিল। এবার পারল না। শেষে আধপোড়া বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার কাজে মন দিল। মেজাজটা তেতো হয়ে গেছে তার। মনে মনে গালাগাল দিল নিবারণ। তারপর পিচ্‌ করে থুতু ফেলল। থুতু নয়। পিক্‌ । পানমশলার।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে মুনিয়া একমনে লক্ষ করছিল নিবারণকে। আর ভাবছিল তার পিসতুতো দিদি পৌলমীদির কথা। কয়েকদিন আগে তাদের বাড়ির ছাদে বসে সে পৌলমীদিকে বলেছিল অভীকদার কথা। অভীকদা ওর বান্ধবী টিনার দাদা। ক্লাস টুয়েলভে পড়ে। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। অভীকদা ওকে সেভাবে পাত্তা দেয় না। কিন্তু মুনিয়া ওর জন্য পাগল। টিনার কাছ থেকে অভীকদার একটা ছবিও জোগাড় করেছে মুনিয়া। সেটা পৌলমীদিকে দেখাতেই পৌলমীদি নাক সিঁটকেছিল, ‘এঃ । এ তো পুরো বুক ওয়ার্ম।’ তারপর সবিস্তারে বুঝিয়ে বলেছিল আদর্শ পুরুষ কেমন হওয়া উচিত। পৌলমীদির বয়ফ্রেন্ড সৈকতদাকে চেনে মুনিয়া। কিন্তু সেও তো অভীকদার মতনই চশমা পরা গুডবয়। ব্যাপারটা গুলিয়ে গেছিল মুনিয়ার। কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ হেসেছিল পৌলমীদি, ‘নো নো। সৈকত ইজ নাথিং বাট এ টাইমপাস। ওকে কে বিয়ে করবে ? আমার বর মাস্ট বি এ মাচো ম্যান। ইউ ডোন্ট সি শাহরুখ ইন ওম শান্তি ওম ? ঠিক ওরকম। বুঝলি? দাঁড়া তোকে একটা জিনিষ দেখাই।’
তারপর নিজের মোবাইল ফোনে এক আশ্চর্য জিনিষ দেখিয়েছিল মুনিয়াকে। একটা নিগ্রো লোক আর এক সুন্দরী ইউরোপিয়ান রমণীর পর্নোগ্রাফি। এমনিতে পর্নোগ্রাফি জিনিসটা নতুন নয় মুনিয়ার কাছে। বান্ধবী পুনমের বাড়িতে কম্পিউটারে ডিভিডি চালিয়ে একবার দেখেছে সে। কিন্তু এই সিনেমাটা তার দারুণ লেগেছিল। দেখতে দেখতে পৌলমীদি ফিসফিস করে ওর কানের কাছে বলেছিল, 'দেখেছিস ? কী সুপার্ব ফিগার ! আ ম্যান স্যুড বি লাইক হিম।’ 
এখন নিবারণকে দেখতে দেখতে সেই নিগ্রোটার কথাই মনে পড়ছিল মুনিয়ার। এই লোকটা অবশ্য ততটা মাচো নয়। আর বড্ড নোংরাও। কেমন বিশ্রীভাবে গুটখা খাচ্ছে আর পিক্‌ ফেলছে। আবার বিড়িও খায়! ভাগ্যিস বিড়িটা ধরাতে পারেনি। বিড়ির গন্ধ সহ্য করতে পারে না মুনিয়া। ওদের ড্রাইভার অবিনাশদা বিড়ি খেত। কী বিকট গন্ধ! ওঃ । গন্ধটা যেন ঝাপটা মারল মুনিয়ার নাকে।
‘বাট, স্টিল … হি ইজ ভেরি ম্যানলি।’ মনে মনে নিজেকে নিজেই বলল মুনিয়া। প্রকৃতপক্ষে নিবারণ সমাজের যে স্তরে বাস করে সেই স্তরের কোনও মানুষকেই এত ভাল করে লক্ষ করার সুযোগ কখনও হয়নি মুনিয়ার। তাদের বাড়িতে যে কাজের লোক আছে তারা নিবারণের থেকে অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠেছে শহুরে জলহাওয়ায় থেকে। এমন গ্রাম্য পরিবেশে সম্পূর্ণ গ্রাম্য চেহারার এক বলিষ্ঠ মানুষকে দেখে তাই এতটাই আশ্চর্য হচ্ছিল মুনিয়া।লোকটা, লোকটার পিছনে সামান্য দূরে বাঁশঝাড়, মাথার ওপরে ধূসর আকাশ, কোথাও কোনও শব্দ নেই, শুধু সামান্য পরে পরে টিউবঅয়েল সারানোর যান্ত্রিক ধাতব শব্দ, মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া – সমস্তটা একটা মস্ত ক্যানভাস হয়ে আকৃষ্ট করে রাখছিল মুনিয়াকে।
এই সময় হঠাৎ বেশ জোরে হাওয়া দিল। নিবারণের চোখ ঢেকে গেল অবিন্যস্ত চুলে। ডান হাত দিয়ে চুল সরাতে গিয়ে নিবারণের চোখ চলে গেল মুনিয়ার ফর্সা পায়ের দিকে। হঠাৎই। নিবারণ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল মুনিয়ার বাঁ পায়ে হাঁটুর সামান্য নীচে এক কুচি রঙীন সুপুরি আটকে আছে। নিঃসন্দেহে তা নিবারণেরই মুখনিঃসৃত। পিক্‌ ফেলতে গিয়ে ছিটকে ওখানে আটকে গিয়ে থাকবে। মুহূর্তে নিবারণের চোখ টেলিস্কোপ হয়ে পৌঁছে গেল সেই ফর্সা নির্লোম পায়ে আটকে থাকা সুপুরির একেবারে কাছে। তারপর খুব দ্রুত সেখান থেকে লাফিয়ে উঠে সমস্ত শরীর ছুঁয়ে পৌঁছল মেয়েটির মুখের দিকে। দেখে যেন নিবারণের প্রাণ জুড়িয়ে গেল। সদ্য কিশোরীটির নির্নিমেষ চাউনি, একমাথা কোঁকড়া চুল নিবারণকে মুগ্ধ করে রাখল বেশ কিছুক্ষণ। ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না মনে হওয়ার সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে নিবারণ আবার কাজে মন দিল।

কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। মুহূর্তে মুনিয়া বুঝতে পারল তার এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। লোকটার চোখের মধ্যে সে দেখতে পেয়ে গেছে এক লোভী পুরুষকে। এ দৃষ্টি এরই মধ্যে তার চেনা। শপিং মলে, ডিভিডি পার্লারে বিভিন্ন জায়গায় অনেকেরই চোখে সে এই লোভ দেখেছে।
চারপাশে ক্রমশ কমে আসা আলোয় বসে থাকা কালো, নিকষ কষ্টিপাথরে গড়া লোকটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ গা ছমছম করে উঠল মুনিয়ার। চারপাশের নির্জনতায় লোকটাকে যেন একটা প্রেত বলে মনে হল। রক্তমাংসহীন। অ্যাবসলিউটলি আনহোলি। নাহ্‌।এবার চলে যাওয়া উচিত। তাছাড়া বাড়িতে যদি এরই মধ্যে কারও খেয়াল হয়ে গিয়ে থাকে সে তার ঘরে নেই, তাহলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই খোঁজ পড়ে গেছে। অবশ্য দিবানিদ্রা ভঙ্গ করে কেউ এই মুহূর্তে তাকে খুঁজবে বলে মনে হয় না। কিন্তু, যদি কেউ জেগে যায় তাহলে যে কপালে প্রচুর ভোগান্তি আছে তা একদম নিশ্চিত। মুনিয়া বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

নিবারণ চেষ্টা করছিল কাজে মন দিতে। কিন্তু পারছিল না। আসলে মেয়েটির মুখের মধ্যে নিজের বৌয়ের কিশোরী মুখের ছায়া দেখতে পেয়েছে সে। আহ্‌। কোথায় গেল তার সেই কচি বৌটা! এখনকার এই তিন ছেলেমেয়ের মা’র মধ্যে সেই কিশোরী বৌটাকে কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে? মুহূর্তে নিবারণের মাথার মধ্যে কে যেন একটা প্রজেক্টর মেশিন চালিয়ে দিল। আর সাদা পর্দায় ফুটে উঠল তার এ যাবৎ স্মৃতির এক প্রতিনিধিত্বকারী কোলাজ, যার মধ্যে মিশে রইল তার বিয়ে, বিয়ের অব্যহিত পরের সেই সব সোনালি দিন, পাশাপাশি ফুটল তার বর্তমানের দিনযাপন – সমস্ত প্রেম, কলহ, ক্রোধ, শোকের এক মিশ্র প্রদর্শনী হয়ে। চোখের সামনে নিজেকে আর তার বৌকে তারুণ্য থেকে মধ্য বয়সের দিকে ক্রমে হেঁটে যেতে দেখল নিবারণ। নিজের অজান্তেই তীক্ষ্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এল যেন। কীভাবে সব হারিয়ে গেল। কিন্তু এই মেয়েটা, নিবারণ জানে এ কখনও হারিয়ে যাবে না। এ যখন তার বৌয়ের বয়সী হবে তখনও এর মুখ থেকে এই ঢলঢলে কাঁচা বয়সের লাবণ্য যাবে না।
যাবেই বা কেন ! নিজের মনে রেগেমেগে বলে নিবারণ। এরা কি আর তার বৌয়ের মতন ঘুঁটে দেবে, বাসন মাজবে, কাপড় কাচবে, খেটে মরবে দিনরাত। হুঃ! এরা তো, দেখেই বোঝা যায়, শহরের বড়লোক বাড়ির মেয়ে, গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ায়।
সেই চিরকালীন ধনী সম্পর্কিত দরিদ্রের চিন্তা! ধীরে ধীরে তা গ্রাস করে ফেলল নিবারণকেও। অচেনা এই মেয়েটির প্রতি একটা রাগ জন্ম নিল শরীরে। মনের গভীরে অবচেতনে মেয়েটির কোমল সৌন্দর্যকে থেঁতলে দেওয়ার একটা বাসনা যেন জন্ম নিল। এ কি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া হিংসা নাকি জিন থেকে জিনেতে বংশানুক্রমিকভাবে চলতে থাকা দারিদ্রজনিত ঈর্ষাস্রোতের নবজাগরণ? কে তার ব্যাখ্যা করবে?

রাগের চোটে সে জোরে জোরে হাতুড়ি ঠুকতে লাগল। কেন দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা এখনও ? কেউ কোথাও নেই – একা একা, কী চায় মেয়েটা? টিউবঅয়েল সারানো দেখতে এত আগ্রহ ? নিশ্চয়ই নয়। তবে ? দাঁড়িয়ে আছে কেন। চলে যাক এক্ষুনি। চলে যাক চোখের সামনে থেকে। রাগী চোখে মেয়েটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠল নিবারণ। মেয়েটা সত্যিই চলে যাচ্ছে ! মুহূর্তে পাল্টে গেল নিবারণের মনের ভাব। তার মনে হল মেয়েটা চলে গেলে সে খুব একলা হয়ে যাবে। এই মেঘলা দুপুরের স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় একটি কিশোরীর ওম থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় যেন শিউরে উঠল সে। তড়িঘড়ি মেয়েটিকে আটকাতে তাই কথা বলে উঠল,‘দিদিমণি চললেন বুঝি ? তা এখানে কার কাছে আসা হয়েছে ?’
- ঐ ওদিকে। সব্যসাচী সেনের বাড়ি। উনি আমার আঙ্কল হন। সামার ভ্যাকেসনে।
- ও। তা এখানে কেমন লাগছে?
- ভাল। ভালই।

এ পর্যন্ত উত্তর দিয়ে সরে পড়তে চায় মুনিয়া। লোকটার হাবভাব তার একদমই ভাল লাগছে না। কিন্তু নিবারণ তাকে সে সুযোগ দেয় না। কথা বলে চলে অনর্গল। অবান্তর সব কথা। মুনিয়া বুঝতে পারে এ সবই তাকে আটকে রাখার ছল। তবু কথার মাঝখানে উঠে যেতে পারে না। আর এই কথোপকথনের সমান্তরালে আরও এক কথোপকথন চলতে থাকে। যা বাতাসে কোনও ধাক্কা দেয় না। সকলের অগোচরে যা অদৃশ্য হয়ে ফুটে থাকে মহাকালের ডায়রীর পাতায়।

- কেন তাকিয়ে আছেন আপনি ওভাবে ? হলুদ, ঘোলাটে চোখ মেলে ? আমার ভয় করছে।
- জানি না। আমি সত্যিই জানি না। শুধু বুঝতে পারছি তুমি চলে গেলে আমি খুব একা হয়ে যাব। এরকম দুপুরে, বাড়িতে থাকলে আমি আমার বৌয়ের সাথে কী করি জান তো ?
- এসব আমায় বলছেন কেন? আপনি আমার চেয়ে কত বড়, লজ্জা করছে না আপনার ? স্কাউন্ড্রেল! ইডিয়ট। আমি যাচ্ছি। আই অ্যাম গোয়িং।
- না যেও না। এই ফাঁকা রাস্তায়, এমন দুপুরে …
- শাট আপ ।
- আমার কী ইচ্ছে করছে জান ? ঐ যে বললাম না বৌয়ের সাথে যা করি …

অদৃশ্য কথামালা ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে নিবারণের শরীরের ভিতর একটা জন্তু ঘুম ভেঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। জিভ চাটছে। ধ্বংসপ্রবণতা আর কাম যেন মিলেমিশে যাচ্ছে তার ভিতর।
কথা বলতে বলতে ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে নিবারণ। মুনিয়ার রিনরিনে কন্ঠস্বর, সরলতা ও ভয় মেশানো দৃষ্টি ভেতরে ভেতরে তাকে উন্মত্ত করে তুলতে থাকে। সে সব কিছু ভুলে যেতে থাকে। ধূসর আকাশ, নির্জন দুপুর ও একটি সুন্দরী কিশোরী ধীরে ধীরে তার সমস্ত চেতনাকে ছেয়ে ফেলে। তার গলা শুকিয়ে আসে। প্রবল ইচ্ছে জাগতে থাকে শরীরের ভেতর। একগুঁয়ে সামুদ্রিক বাতাসের মতন তা গোঁ গোঁ করে বইতে থাকে শরীরময়।

মুনিয়া বুঝতে পারে লোকটা ক্রমেই অপ্রকৃতিস্থ হয়ে উঠছে। সে ঠিক করে লোকটার কথার মাঝখানেই তাকে চলে যেতে হবে। সেই মত ‘আমি আসি’ বলে সে পিছন ফিরতে চায়, কিন্তু নিবারণ হঠাৎ ‘দিদিমণি, আপনার হাটুঁতে সুপুরি’ বলে একলাফে তার পা টা জড়িয়ে ধরে। তারপর মুহূর্তে তাকে পাঁজাকোলা করে ছুটতে থাকে বাঁশঝাড়ের দিকে।

এইসময় একটা হাওয়া ওঠে। খুব জোরে। বাতাস যেন তার সর্বশক্তিতে আর্তনাদ করে ওঠে, ‘না নিবারণ, না। এমন কোরো না। তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না তোমার শরীর থেকে খসে খসে পড়ছে মনুষ্যধর্মের সমস্ত বৈশিষ্ট্য। তুমি … তুমি একবারও ভেবে দেখছ না … ঐ মেয়েটি যাকে ধর্ষণ করে, হত্যা করে তুমি ভাসিয়ে দেবে খালের গাঢ় কালো শোকের মতন জলে, তার মৃত শরীরের ভেসে চলা দেখে তোমার মনে পড়ে যাবে, তোমার মেয়ের কথা … সেও তো ওই মেয়েটিরই বয়সী … তুমি হতভম্ব হয়ে যাবে … তারপর সমস্ত অবশিষ্ট জীবন চোখের পাতা বন্ধ করলেই তোমার স্ত্রী নয়, মেয়ে নয়, ছেলে নয়, বাবা-মা-ভাই-বোন কারও না … তোমার সবচেয়ে আগে মনে পড়বে ঐ মেয়েটিরই কথা … কারাগারের প্রগাঢ় অন্ধকারে বসে সেদিন যতই আক্ষেপ কর … ঐ মেয়েটির গাঢ় বাদামি ভয়ার্ত মুখ তোমাকে একটু একটু করে ধ্বংস করবে … করবেই … নিবারণ … পশু হতে দিও না নিজেকে … না নিবারণ, না … ছেড়ে দাও ওই মেয়েটিকে … আর নিজেও মুক্ত হও, সারাজীবনের মতন ঐ মুখশৃঙ্খল থেকে … ’

হায় । প্রকৃতির ভাষা মানুষ আজও বুঝতে পারে না !


                                                  HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]