website design software mac
মীনাক্ষী সেন
তোমারে বধিছে যে 


গল্প           Home


সেদিন শ্রাবণসন্ধ্যা।
কদমফুলের গন্ধে আকুল বাতাস। মালতি ফুল ফুটেছে। মাধবীলতায় দুলছে নতমুখী মাধবী। কনকচাঁপা, যূথী আর কেতকীর সুবাস জলকণার সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে চারধারে। দুলছে নাগকেশরের কেশর, নবমল্লিকা ফুলে ঘুরে ঘুরে গুঞ্জন করছে মধুকর। কখনও গিয়ে বসছে অশোক, কুন্দ, কিংশুক বা শিরিষফুলে। ডালিমগাছে ঝুলছে সুপক্ক ডালিম। কামরাঙা গাছ ফলের প্রাচুর্য নিয়েও হাওয়ায় তার শরীর দোলাচ্ছে। লেবু, জলপাই, চালতা আর তেঁতুলগাছের পাতার মৃদু সঞ্চালনে জলকণা ভরা বাতাস শিরশিরানি জাগাচ্ছে সর্বাঙ্গে। নারকেল আর তমালগাছের পাতারাও দুলছে। চন্দনগন্ধে ভরে উঠেছে চন্দনবন। বৃন্দাবনের কুসুমিত লতাকুঞ্জে রাধার অপেক্ষায় বসে রয়েছেন বনমালি শ্রীকৃষ্ণ। যে গাভিগুলিকে নিয়ে তিনি গোচারণে এসেছিলেন সকালবেলা, তারা চারধারে ঘুরে ঘুরে ক্ষুধা মেটাচ্ছে বৃন্দাবনের নরম তৃণদলে। ধীরে ধীরে অপরাহ্ণ নেমে আসছে পৃথিবীতে।   
এইসময়ে মা যশোদা ব্যস্ত রয়েছেন তার দুগ্ধবতী গাভিগুলোর আহার্য প্রস্তুতির তদারকিতে। কানাই ঘরে ফিরবে গোধন নিয়ে। তারপর আহার করবে তারা। তবেই শুরু হবে বৈকালিক দুগ্ধদোহন পর্ব। দাসীরা গোহাল পরিষ্কার করে ধুনার ধোঁয়ায় মশা দূর করছে। গাভিদের যত্নের সমস্ত আয়োজন প্রায় সম্পূর্ণ। এমন এক শান্তিভরা মায়াময় অপরাহ্ন হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল বৃহদাকার রথের ঘর্ঘর শব্দে।
--- এই অসময়ে বহিরাগত কে এল গোকুলে রথের আরোহী হয়ে ?
দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রাম শেষে মহারাজ নন্দ তার সান্ধ্য মজলিশে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তিনি এগিয়ে গেলেন বহির্দরজার দিকে।
--- রথের শব্দ যেন আমার ঘরের দরজায় এসে থামল !
নন্দ বাইরে এলেন। নন্দ-গৃহের সামনে এসে থেমেছে বিশাল রথ। তার মাথায় উড়ছে মথুরাধিপতি কংসের পতাকা। রথ থেকে নিচে নেমে এসে দাঁড়িয়েছেন সারথি অক্রুর। শশব্যস্তে এগিয়ে গেলেন রাজা নন্দ। অক্ররের অভ্যর্থনায় ত্রুটি থাকলে চলবে না। কে না জানে, বলদর্পী, মহাক্রোধী মহারাজা কংসের মেজাজ-মর্জির কথা। তার দূত হয়ে নিশ্চয়ই এসেছে অক্রুর। কংসের দূতকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি --- এমন কথা কংসের কানে উঠলে মহাবিপদ ঘটবে।
ইতিমধ্যে যশোদাও এসে দাঁড়িয়েছেন আঙিনায়, নন্দর পাশে।
--- যশোমতী, মহামানী অক্রুর এসেছেন। পদপ্রক্ষালনের জলপাত্র পাঠাও।
নন্দ বললেন স্ত্রীকে। তারপর এগিয়ে গিয়ে স্বাগত জানালেন অক্রুরকে।
--- আসুন সারথিবর। মহারাজ নন্দের গৃহ আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
অক্রুর মৃদু হাসলেন সৌজন্যে। যেন বাধিত হলেন এমন মুখের ভাব করে প্রবেশ করলেন নন্দ-গৃহের আঙিনায়। ইতিমধ্যে নিজ হাতে জলপাত্র নিয়ে এসেছেন যশোদা। দাসদাসীর হাতে না পাঠিয়ে নিজ হাতে সেবা করে অক্রুরকে সম্মানিত করতে চাইলেন তিনি।
--- আসুন মান্যবর। হাত-পা প্রক্ষালন করুন।
যশোদা অক্রুরকে ডাকলেন আঙিনার একধারে। অক্রুর সবিনয়ে যশোদার হাত থেকে জলপাত্র গ্রহন করলেন।
--- অপরাধী করছেন এই অধমকে।
বলে হাত-পা ও মুখ জলে ধুয়ে পরিষ্কার করলে, রাজা নন্দ নিজ হাতে এগিয়ে দিলেন শুষ্ক গাত্রমার্জনী। অক্রুর সংকুচিত বিনয়-হাস্যে তা গ্রহন করে হাত-পা মুছে প্রবেশ করলেন নন্দের গৃহে।
--- আসন গ্রহন করুন।
নন্দ নিজ আসনে বসে অক্রুরকেও বসালেন আরাম আসনে। যশোদাও ঘরে প্রবেশ করেছিলেন। অক্রুর আগের চেয়েও বেশি বিনীত হয়ে বললেন, --- নিভৃতে আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে মহারাজ।
কোথায় বলে, বুদ্ধিমতীর জন্য ইশারাই যথেষ্ট। যশোদা রন্ধনশালা অভিমুখে চলে গেলেন অক্রুরের আহার্যের ব্যবস্থা করতে। গেলেন, দাসদাসীদের আদেশ নির্দেশ দিয়ে অক্রুরের জলপানের ব্যবস্থা শুরু করে দিলেন, কিন্তু কোনো কাজে মন লাগছিল না তার। কী এক অশুভর সংকেতধ্বনি শুনেছিলেন তিনি অক্রুরের রথের ঘর্ঘরে। আশঙ্কায় ভরে উঠেছিল তার মন আশঙ্কার কারণ না জেনেই।
--- কানাই ! আমার কানাই কেন ঘরে ফিরল না এখনও ? অন্ধকার হয়ে এল !
বলে একবার তিনি ছুটে বের হলেন আঙিনায়, আবার এসে ঢুকলেন রন্ধনশালায়।
--- কেন এল এই লোকটা ? ওই অক্রুর ! কংসের অনুচর।
তিনি অক্রুরের জলপানের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করতে করতে অক্রুরকেই অভিসম্পাত করতে চাইছিলেন যেন। ওদিকে অক্রুর তখন মহারাজ নন্দের সামনে পূর্ববৎ বিনয়-বচনে নত।
--- মহারাজ অপরাধ নেবেন না এ অধমের। মহামহিম কংসের আদেশেই কানাই ও বলাই দুইজনকেই মহারাজ কংসের দরবারে নিয়ে যেতে এসেছি আমি।
ইতমধ্যে গোধূলি অবসানে রাত নেমে এসেছে পৃথিবীতে। দাসীরা ঘরের কুলুঙ্গিতে কুলুঙ্গিতে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে পিতল-প্রদীপ। সে আলোর যত উজ্জ্বলতা, তার পেছনে জমেছে ততই আঁধার। ছায়ারা কাঁপছে এলোমেলো, নন্দ-গৃহের সুচিত্রিত দেওয়ালে দেওয়ালে।
অক্রুরের কথা শুনে মহারাজ নন্দ কিন্তু অবাক হলেন না, চমকে উঠলেন না। বরং এসময় তার চোখ দেখে মনে হল যেন সে দৃষ্টিপাতে কোনো সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হল। হয়তো আশঙ্কা ছিল সেই চোখে, ছিল স্নেহদুর্বল পিতৃহৃদয়ের কাতরতা, কিন্তু বিস্ময় ছিল না সে চোখে। যেন সবই জানেন, তবু জিজ্ঞেস করতে হবে তাই কর, এমন অবহেলায় তিনি অক্রুরকে বললেন --- কিন্তু এমন আদেশ কেন দিলেন মহারাজ কংস, জানতে পারি কি ?
--- নিশ্চয়ই।
অক্রুর নিজের অজান্তে দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন। যেন তিনি এক অপরাধী।
--- মহারাজ কংস ধনুর্ময় যজ্ঞ করবেন। যজ্ঞস্থলে নানা আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মহাবলী কংসের দরবারে রয়েছে দুই মহাবীর মল্লযোদ্ধা মুষ্ট্যক আর চানুর। তারা নাকি অপরাজেয়। অথচ কানাই-বলাই-এর বীরত্বের খ্যাতি গোকুল ছাড়িয়ে মথুরায় পরিব্যপ্ত। মহারাজ তাই চান কানাই-বলাই-এর সঙ্গে মুষ্ট্যিক ও চানুরের মল্লযুদ্ধ হোক। যারা জিতবে, তাদের সোনায় মুড়ে দেবেন মহারাজ কংস।
--- আমরা সামান্য গোপালক। সোনায় আমাদের কী প্রয়োজন ?
একথা বলে মহারাজ নন্দ যেন বোঝাতে চাইলেন, কংস রাজাধিরাজ হলেও তিনিও রাজা। অর্থলোভ তাকে দেখানো নিরর্থক। অক্রুর বুঝলেন বৈকি একথার অর্থ। তিনি দৃষ্টি নত করলেন। নন্দ বললেন --- তবে মান্যবর একটি কথা। কৃষ্ণ যাবে আপনার সঙ্গে, এ অনুমতি আমি দিচ্ছি। আমি তার অধিকারী। কিন্তু বলাই যাবে কিনা, সে বিষয়ে অনুমতি দেবার আমি অধিকারী নই। সে রোহিনী-বসুদেবের সন্তান। তাকে মথুরায় নিতে হলে আপনার তাদের অনুমতি নিতে হবে।
--- বসুদেব জানেন সব। তাঁর অনুমতি আছে।
অত্যন্ত নিচু গলায় কথাটি বললেন অক্রুর। নন্দ শুনলেন, যেন অনেককিছু বুঝে নিলেন, কিন্তু অক্রুরকে বুঝতে দিতে চাইলেন না। অক্রুর আবার বললেন,
--- তিনিই চাইছেন, কানাই-বলাই দুজনেই আসুক কংসের দরবারে।
নন্দ একথার সরাসরি কোনো উত্তর দিলেন না। অক্রুর তার কাছে কংসের দূত। বসুদেবের নয়। কাজেই বসুদেবের সঙ্গে নন্দের কতটুকু যোগাযোগ ও সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা কী পর্যায়ে তা বুঝতে না দিয়েই তিনি বললেন --- বেশ তো, পিতার অনুমতি থাকলে বলাইও যাবে। কাল প্রাতে আপনার সঙ্গে মথুরার রাজদরবারে যাবার জন্য আমি প্রস্তুত থাকতে বলে দেব কানাইকে।
নন্দ যখন একথা বলছেন, তখন দাসীদের হাতে খাদ্যপাত্র সাজিয়ে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন যশোদা। কানাই কাল প্রাতে মথুরার রাজদরবারে যাবে অক্রুরের সঙ্গে --- নন্দের এই কথাগুলো যেন আগুনের শলাকার মতো বিদ্ধ করল তার হৃদয়কে। চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রবল চেষ্টায় আত্মসংবরণ করলেন। ঘরে ঢুকে নতমস্তকে অভিবাদন জানালেন অক্রুরকে। তার সামনে সাজিয়ে দিলেন খাদ্যপাত্র, সুগন্ধী জল। যদিও সেই মুহূর্তে অক্রুরকে রাক্ষসের দূত এক পরস্ব-অপহরণকারী ছাড়া অন্য কিছু মনে হচ্ছিল না তার।তবু রানির উপযুক্ত আত্মমর্যাদায় নিজেকে ধরে রেখে তিনি বললেন
--- আপনার যদি অনুমতি হয়, তবে আমি মহারাজের সঙ্গে দুটি সাংসারিক কথা বলে নিতে চাইছি।
--- অবশ্যই মহারানি । সেজন্য এই অধমের অনুমতি চেয়ে বিড়ম্বিত করলেন মাত্র। অক্রুরের কথায় স্পষ্ট যে, তিনি জানেন এ সম্মান তাকে দেখানো হচ্ছে না। এ সমীহ দেখানো হচ্ছে রাজা কংসের দূতকে। নন্দও এবার উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
--- হ্যাঁ আপনি আহার্য গ্রহন করে সামান্য বিশ্রাম করুন। আমারও তো কিছু কাজ আছে। খালি হাতে তো আমি কানাইকে পাঠাতে পারব না মহারাজের দরবারে। গোকুলবাসীকে খবর পাঠাতে হবে তারা যেন যার যা সামর্থ্য, নিয়ে আসেন আমার গৃহে। আপনার সঙ্গে সে সওগাত পাঠিয়ে দেব মহারাজার দরবারে। সে কাজে যেতে চাইছি আমি।, আবার আমাদের মধ্যে দেখা হবে রাতের আহারের সময়।
অক্রুর পূর্ববৎ বিনয়ে মাথা নাড়লেন। তিনি ক্ষুধার্ত হয়েছিলেন। আহার্যের সুগন্ধ তাকে আকর্ষণ করছিল। আহারে মন দিলেন তিনি। দাসীরা ব্যজন করতে লাগল। তাদের হাতে চুড়িতে আওয়াজ উঠল রিনিঠিনি ঠিন।
--- মহারাজ।
ক্রোধে, ক্ষোভে ফেটে পড়লেন যশোদা শয্যাকক্ষে।
---আপনি কী করে রাজি হতে পারেন কৃষ্ণকে মথুরায় পাঠাতে ? আমার ওই নবনীত কোমল বালকের সঙ্গে মল্লযুদ্ধের কী সম্পর্ক ?
--- রাজা কংসের এমনই তো আদেশ যশোমতী। কংসের আদেশের উল্লঙ্ঘনের পরিণাম তুমি জান না?
--- সে পরিণামের ভয়ে তুমি তোমার সন্তানকে তুলে দেবে এক ঘাতকের হাতে ? কানাইয়ের শিশুকাল থেকে তাকে হত্যা করার জন্য কী না করেছে কংস --- এখন কৃষ্ণকে তুলে দেবে সেই কংসের থাবার ভেতরে ? তাকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ে নিজেকে নিরাপদ করতে চাইছ তুমি মহারাজ ?
--- রানি, আমার বিপদের কথা নয়, কংসের আদেশ না মানলে সে দুষ্ট বিপন্ন করতে পারে পুরো গোকুলকে। 
--- আমার কৃষ্ণের জন্য সমস্ত গোকুল বুক পেতে দেবে, তবু তারা যেতে দেবে না কৃষ্ণকে কংসের দরবারে।
একথা বলার সময় স্ফীত হয়ে উঠল যশোদার মাতৃহৃদয় কত না গর্বে। তার পুত্রকে গোটা গোকুল প্রাণাধিক ভালোবাসে। এ গোকুলের সে নয়নমণি, একথা ভাবতে কোন্ মাতৃহৃদয় না স্ফীত হবে !
--- এত ভালোবাসার প্রতিদানে কি তোমার কৃষ্ণ বিপন্ন করবে তাদের জীবন ? নন্দ বললেন। তারপর নামিয়ে নিলেন গলা। খানিক চুপ থেকে বললেন --- তাছাড়া কৃষ্ণের যেতে হবে কারণ বসুদেবের তেমনই ইচ্ছা।
--- তার ইচ্ছায় আমার কৃষ্ণ মথুরায় যাবে কেন ?
যশোদা তীব্র, তীক্ষ্ণ হলেন।
--- সত্যি বটে সে তোমার অন্তর। সখা। কিন্তু আমার কৃষ্ণকে মথুরায় যেতে বলার সে কে ? আমি তার মা, তুমি পিতা। আমরা তাকে যেতে দেব না। 
নন্দ চোখ বন্ধ করে ফেললেন। হাত মুঠো করে চুপ করে রইলেন। কত সময় পার হল, তা বলা যায় না। এইসব সময়ের পরিমাপ ঘড়ির কাঁটার ঘূর্ণন দেখে নির্ণয় করা অসম্ভব। একটি মুহূর্তও এত দীর্ঘ হয়ে ওঠে এসময়। চোখ বন্ধ করে নন্দ যেন হৃদয়-মধ্যে শুনতে পেলেন ঝড়বিক্ষুব্ধ সে দুর্যোগ-রাতের উত্তাল যমুনার প্রলয় কলকল্লোলের শব্দ। তারপর একসময় চোখ খুললেন। হাতের মুঠো খুলে প্রসারিত করতল দুটি স্থাপন করলেন প্রিয়তমা স্ত্রীর দুই কাঁধে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন --- আমি নই যশোমতী। সে তোমার কৃষ্ণের জন্মদাতা পিতা। কৃষ্ণ দৈবকী-বসুদেবের সন্তান।
--- কী প্রলাপ বকছ উন্মত্তের মতো ! তাহলে কেবল আমি নই, তুমিও ভয় পেয়েছ কংসের আদেশ শুনে। না হলে এ প্রলাপ কেন ? রানিত্ব ভুলে চিৎকার করে উঠলেন যশোদা।
--- প্রলাপ নয় রানি। আমি সত্য বলছি। কৃষ্ণ দৈবকী গর্ভজাত।
--- অসম্ভব ! অসম্ভব মহারাজ !
যশোদা তার দুটি হাত স্থাপিত করলেন নিজ উদরে। তারপর বললেন --- অসম্ভব ! এ উদর তো শূন্য ছিল না মহারাজ ! আমি পূর্ণগর্ভা ছিলাম। প্রসববেদনা অচেতন করে ফেলেছিল আমাকে। জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখি, কৃষ্ণ এসেছে আমার কোল আলো করে।
মহারাজ চোখ বন্ধ করে যেন দেখলেন সেই প্রলয়-গর্জন-মত্ত অশোকাষ্টমীর কৃষ্ণজন্মরাত্রটিকে। মহারাজ নন্দ কি অজানা কারণে সেদিন সমস্ত দাসদাসীদের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছিলেন – অথচ সেই দিনটিতেই প্রসববেদনা দেখা দিল যশোদার – সঙ্গে এল প্রলয়। ঝরঝর বৃষ্টিধার, ঘন ঘন বিদ্যুতপাত, আর যমুনার প্রবল গর্জন – প্রসবব্যথায় বিবশ হতচেতন যশোদা জ্ঞান ফিরতে দেখেছিলেন বাড়ি ভরে গেছে মানুষে। প্রলয় থেমে গেছে। সমস্ত বাড়িতে জ্বলছে মঙ্গলদীপ। সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোটি জ্বলছে তার কোলের কাছে। হাত মুঠো করে সেখানে ঘুমোচ্ছে শিশু কৃষ্ণ। তাকে দর্শনমাত্র যশোদার স্তন থেকে ছুটে এসেছিল দুধের ধারা।
--- আহারে তুমি বলছ সে আমার নয় ! তবে আমার গর্ভের সন্তান কোথায় গেল ? আমি কি তবে মৃতবৎসা ?
হাহাকার করলেন যশোদা, রাজেন্দ্রাণী ভিখারিনি হলে যেভাবে আর্তনাদ করে তেমনই সব হারানোর তীব্র ব্যথায়। আশংকায়।
--- না যশোমতী। তুমি মৃতবৎসা নও। সর্বাঙ্গসুন্দরী এক সর্বসুলক্ষণা কন্যার জন্ম দিয়েছিলে সেই রাতে। তখনই বসুদেব যমুনা পার হয়ে নিয়ে এসেছিল সদ্যোজাত কৃষ্ণকে। তুমি তো জানই, ছয়টি সন্তানকে এর আগে হত্যা করেছিল পাষন্ড কংস। বসুদেব কৃষ্ণের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল আমার কাছে। তাই আমাদের কন্যাকে আমি সমর্পণ করেছিলাম তার হাতে। আর কৃষ্ণকে তুলে দিয়েছিলাম তোমার কোলে। পাপী কংসকে হত্যা করার জন্য কৃষ্ণের জীবনরক্ষার প্রয়োজনে। যশোদা নিঃশ্বাস বন্ধ করে বিস্ফারিত চোখে চাইলেন নন্দের দিকে --- তারপর ?
--- তারপর পাপিষ্ঠ কংস সে শিশুকন্যাকে পাষাণে আছাড় মেরে হত্যা করে।
--- কন্যা ! হায় আমার অভাগিনী কন্যা ! প্রবল ক্রন্দনে আলোড়িত হল যশোদার পূর্ণ শরীর --- আমার কন্যা, আমারই গর্ভজাত। নয়মাস আমার এই উদরে তাকে পালন করেছি, তাকে মৃত্যুর হাতে সমর্পণ করার আগে তুমি আমাকে কিচ্ছু জানানোর দরকার মনে করলে না ! এই তবে তোমার কাছে আমার মূল্য। এক কানাকড়িও নয়।
--- যশোমতী অকারণে পীড়িত কোরো না নিজের হৃদয়। সে কন্যা থাকতে আসেনি। সে ছিল সাক্ষাৎ মহামায়া।
--- সে যদি মহামায়া, মহিষাসুরমর্দিনী, তবে কংস বধে কৃষ্ণের কী প্রয়োজন ছিল ? যদি হতভাগ্য দৈবকী আর বসুদেব কৃষ্ণের জীবনরক্ষা করতেই চেয়েছিল, তাহলে আমার কন্যাকে আমার কোলে রেখেই কৃষ্ণকে তুলে দিতে পারতে আমার কোলে। সে দুর্বৃত্ত তো জানতই, তার বিনাশ যার হাতে বড়ো হচ্ছে সে গোকুলেই। তাই তো পুতনা, তাই তো বকাসুর।
--- সে কন্যা যে বলে গেল যশোমতী। মৃত্যু-মুহূর্তে সেই অলৌকিক কন্যা কংসকে বলে গেল – ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’ – তাইতেই কংস সন্ধান পেল কৃষ্ণের।
--- হায় রে পুরুষ ! তবু বুঝলে না নিজ কন্যার তিরষ্কার ? তার জীবন ধ্বংস করে কৃষ্ণকে রক্ষা করার তোমাদের দুই পুরুষ-প্রবরের সিধান্ত যে কত অকারণ, তা বলে গেল সে। বিদ্রুপ করে গেল তোমাদের।
--- যশোমতী শান্ত হও।
--- শান্ত হব ? শান্ত হব কিসে ? আমার কন্যার জন্ম গোপন রাখলে আমারই কাছে --- শান্ত হব একথা জানার পর ? আমি তোমার ঘরণী, আর অপর এক পুরুষের সঙ্গে মন্ত্রণা করে আমার কন্যাকে মৃত্যুর হাতে তুলে দিলে, শান্ত থাকব একথা শুনেও ! আসলে নারীজীবনের কোন মূল্যই নেই তোমাদের কাছে মহারাজ। তাই পদদলিত করেছ আমার মাতৃত্বের অধিকার আর নিজ কন্যাকে সমর্পণ করেছ মৃত্যুর করাল থাবায়। কন্যা হন্তারক মহারাজ –-- ধিক্, তোমাকে ধিক্। 


                                                       HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]