what is the best website builder
বরুণ তালুকদার    
একটা পাঁচ 

গল্প            Home


গার্লস হোস্টেলের পাশেই ব্যস্ত মোড়ের মাথায় পিকুর মোবাইল রিচার্জের দোকান। দোকানের সামনে ছেলেমেয়েরা ভিড় জমায়। ছোট্ট ঘুপচি খোপ একটা। তার মধ্যেই শোকেস। ডিসপ্লে। কোনদিন হয়ত শুরু করেছিল অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এখন শুধু পুরোনো মোবাইলের খোলস, তারের বটঝুড়ি, আর খুটখাট জিনিস। কিন্তু পিকু সবসময় ফোন কানে ব্যস্ত থাকে। ডান কানে বাম কানে ফোন। তার কিছু পরিচিত সার্কেল আছে। তারাই ফোন করে করে মোবাইলে রিচার্জ করে নেয়। তারপর যাতায়াতের পথে কোন সময় টাকাটা মিটিয়ে দিয়ে যায়। সবার কাছ থেকে প্রাপ্য টাকার কথা যে ঠিকঠাক মনে থাকে তাও নয়। কিন্তু তারাই নিজেদের দায়ে সততা বজায় রাখে। আরে পিকু কাকু, সেই যে পড়শুদিন রাতে টাকাটা ভরে দিলে, মনে নেই ? – ও তাই তো, মনে পড়েছে। আসলে এত কাস্টমারের চাপ তো! ফাঁকা দোকানে টুলে বসে দোল খেতে খেতে পিকু জবাব দেয়। তারপর আবার কারো ব্যালেন্সের অনুরোধে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। - হ্যা পিকু বলছি, কোন বৌদি বলছেন বলুন তো! ও আপন ঘর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে? রাজু দার ওয়াইফ? তাই বলুন। হ্যা বৌদি কত টাকার দেব? মাত্র দেড়শ? কেন বাপের বাড়ির সবাই কি আজকাল কথা বন্ধ করে দিচ্ছে আপনার সাথে, অ্যা? --- না না কোন সমস্যাই নেই। --- রাজু দা এদিক দিয়ে যখনি যাবে, তখন দিয়ে দিলেই হল……
রাতে পিকুকে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত রাখে পাশের হোস্টেলের মেয়েরা। ওদের তো রাতেই বেশি রিচার্জ লাগে। দিনে কলেজ। টিউশান। রাতে বাড়ির সাথে কথা বলে। নেট ঘাঁটে। এইসব করে মাঝরাতে ঝপ করে টাকা খতম হয়ে যায়। হয়ত কিছু ডাউনলোড করছিল। হ্যালো পিকু কাকু প্লিজ় প্লিজ় প্লিজ়। ঘুম জড়ানো গলায় পিকু জানতে চায় – কত টাকার? কত নাম্বার রুম? ও মণিপুর তো, ঠিক আছে। ত্রিপুরার সাথে থাকো তো এক রুমে? দিচ্ছি। ত্রিপুরার মামনিকে বোলো তো ওর একটা ডিউ আছে!
পাশের ঘর থেকে পিকুর মা বকবক করে। কি ব্যবসা রে বাবা। রাতেও ছেলেটাকে ঘুমুতে দেয় না। সারাদিন দোকান করে তো কাহিল হয়ে এলি। ছোট্ট ওই খুপড়িটাতে ঘাড় গুঁজে বসে থাকে। রাতেও দেখো বালিশের কাছে দোকান খুলে বসেছে। বলি বিয়ে হলে কি করবি ?
পিকুর বিয়ে হয় না। বিয়ে করার জন্য অন্ততঃ একটা দিন সময় দিতে হয়। মেয়ে দেখার জন্য। পিকুর সেই সময়টাই হয় না। গত পাঁচ বছরে হয় নি। একদিন অবশ্য গোটা শহরের সমস্ত নেটওয়ার্ক ডাউন হয়ে গিয়েছিল। সারাদিনে কেউ ফোন ব্যবহার করতে পারবে না বলে খবর পাওয়া গেল। তা পিকু সিনেমা দেখতে গিয়েছিল সেদিন।একটা মেয়েকে দেখে বেশ লেগেছিল তার। ছোটখাটো টপ জিন্স পড়া লক্ষ্মী ঠাকুরের মত দেখতে। বিয়ে করার বেশ ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু সেই ভাল লাগাটাকে পঙ্গু মায়ের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে দেবার মত নেটওয়ার্ক তার ছিল না। সন্ধেবেলাতেই সব কোম্পানির টাওয়ার খাড়া হয়ে গেল। আর সবাই যেন সারাদিনের প্রতিশোধ নেবার জন্য এন্তারসে রিচার্জ করতে লেগে গেল। পিকু ভীষণ ব্যস্ত হয়ে গেল। রাতের বেলা মেয়েটার মুখটাই আর মনে করতে পারল না। স্বপ্নের মেয়েটা যে অটোটাতে চড়েছিল সেটার নাম্বারটাও মনে নেই। ব্যাস ল্যাঠা চুকে গেল।
মাঝরাতে ঘুম আর না এলে পিকু দু একজন মেয়ের মুখ মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু সবার গলার আওয়াজটাই তার কাছে স্বচ্ছন্দে আসে। কিন্তু মুশকিল হল গলার আওয়াজ দিয়ে ঠিক জমে না। কিন্তু পিকু কি করে। সে তো কোন কিছু ভাল করে দেখেই না। তার তো কানের কাজ। তার চোখের সামনে দিয়ে দোকানের সামনে দিয়ে হাজার হাজার ছেলে মেয়ে চলে যায়। পিকু দেখে কিন্তু দেখে না। সে শুধু শোনে। সে ব্যালেন্স ভরে দেয়। ব্যালেন্স ভরার জন্য ভাল করে দু চোখ মেলে দেখার কি দরকার। আবার ফোন টা বেজে ওঠে। রাত একটা পাঁচ। ঠিক এই সময় বড় একটা কেউ ফোন করে না। এই সময় কে যেন --- হ্যালো পিকুদা? ঘুমুলে? 
তাকে তো কেউ আর দা বলে না এখন! এখন তো সব মেয়ে তাকে কাকু বলে ডাকে। দা বলে ডাকার মেয়ে কে আছে রিচার্জ ভরার জন্য।
--- কে কে?
--- কেন ভুলে গেলে পিকু দা আমি একটা পাঁচের মেয়ে। গার্লস হোস্টেল।
--- সে কি করে সম্ভব? সে তো পাঁচ-ছ বছর আগের কথা। তুমি তো কবে এ শহর ছেড়ে চলে গিয়েছ। কত দূর দেশে চলে গিয়েছ হয়ত তুমি।
--- হ্যাঁ । ঠিক বলছ পিকু দা। আমি পার্থে থাকি এখন। জানো তো আমার না কাল সন্ধেবেলা ডিভোর্স হয়ে গেল। বহুদিন পর আজ আমি আবার একা বিছানায় শুয়ে আছি পিকু দা। সেই কলেজ। সেই হোস্টেল লাইফের জন্য কেমন মনটা করছে। যদি যাদু বলে আবার সেই জীবনে ফিরে যেতে পারতাম। তুমি এখনও আমার নাম্বার মুছে দাওনি একটা পাঁচ।
--- কেন কেন? আমি তো থানার নাম্বারও মুছে দিই না।
--- রাতে ফোন করলে তোমাকে পাব আমি। আমি জানি পিকু দা।
--- আমাকে পেয়ে তুমি কি করবে। আমি কোথায় তুমি কোথায়।
--- কি জানি! তবু তো এক ফোনে একজনকে পাব। তাই নাম্বারটা মুছে দিইনি। তাছাড়া হয়ত ভেবেছি, হঠাৎ মাঝরাতে কোনদিন, কোথাও যদি রিচার্জের দরকার হয়। তোমার কাছে চাইব।
--- সে কি? আর টাকা ফেরৎ দেবে কেমন করে?
--- তুমি জান পিকুদা এখন পার্থে কটা বাজে?
--- না তো জানি নাতো। একটা পাঁচ বাজে না?
--- না পিকু দা। বাজে না । কিন্তু আমার ঘড়িতে অস্ট্রেলিয়াতে বসেও ঠিক সময়ে একটা পাঁচ বাজে ।



                                                  HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]