free website builder

গল্পাণু            Home    
সদানন্দ সিংহের তিনটি অণুগল্প



ব্যাপারী

সুরেশের মত আদার ব্যাপারী লোকদের একটু জাহাজের খোঁজ রাখতে হয়। নইলে দিনান্তের শেষে লাভের গুড় পিঁপড়েই খেয়ে নেয়। আদার ব্যবসা এখন যদিও তার মজ্জাগত। কোন্ গ্রামের কোন্ আদা চাষির বাপ মারা গেল, কোন্ চাষির মেয়ের বিয়ে, কোন্ চাষির বৌ রোগাক্রান্ত --- এসবের খোঁজ নিয়ে কিছু চারা ছেড়ে রাখে বড়শিতে মাছ তোলার জন্যে। এভাবেই সে লাভ করে করে দু’বোনের বিয়ে দিল, নিজের একতলা বাড়িটা বানিয়ে নিল। ওভার-স্মার্ট এক মেয়েকে বৌ করে আনল। বুড়ি মা কিছুই বলেনি। ভাগ্যিস বাবা নেই। সেই পনের বছর আগে ক্যান্সারে মারা গেছেন। বাবা হয়ত কোনদিনই চাইতেন না এইরকম ওভার-স্মার্ট মেয়ে। বৌটাও তার মতই, বরং বলা যায় তার থেকে হয়ত একটু বেশি; চারা ছাড়ার আগে রিটার্নটার হিসেব করে নেয়। আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠছে সুরেশরা। ইদানীং একটু রাজনীতির ভেতরও ঢুকে গেছে সে। বৌ তো বলেই দিয়েছে, ভবিষ্যৎ তাদের উজ্জ্বল সেখানে।

আসলে সুরেশ ঠিক আদার ব্যাপারী না। সে একটা জাহাজের খোঁজে ছিল। আসলে সে জাহাজের ব্যাপারীই।


পুরুষগিরি

দাসবাবুর মেয়ের ছেলে অর্থাৎ দাসবাবুর নাতির অন্নপ্রাশন। ফ্ল্যাট বাড়িতে অনেক লোক নিমন্ত্রিত। আত্মীয়স্বজন অনেকেই এসেছেন। এছাড়া দাসবাবুদের ফ্ল্যাট এবং পাশের ফ্ল্যাটের অনেক লোকজন এসেছেন। রান্নার জন্যে কমলির একটু নামডাক আছে। তাই কমলিকে ভাড়া করে আনা হয়েছে। কমলি রান্নায় ব্যস্ত। কাছে কোথাও সন্ধে-বাতির উলুধ্বনি শোনা যায়। এই এক আশ্চর্য, কোন কোন ফ্ল্যাটে এখনো সন্ধে-বাতি হয়, উলুধ্বনি হয়।
কমলি মাঝে মাঝে ফ্ল্যাটের বাইরে বেরুচ্ছে বিশ্রামস্বরূপ বা টাটকা বাতাস খাওয়ার জন্যে। আর বেরিয়েই সে দরজার বাইরে রাখা জুতোগুলি দেখে যাচ্ছে কি কি ধরনের সুন্দর জুতো রাখা আছে। কমলির বরাবরের শখ বিভিন্ন ধরনের নতুন জুতোর প্রতি। দাসবাবুদের ঘরটা দোতলায় ও সিঁড়ির কাছে। কমলি সিঁড়ির একটু নিচে নেমে সিঁড়ির জানালা দিয়ে বাইরে নিচে তাকায়। ও দেখে নিচে তার কথামত শিলু অপেক্ষা করছে। শিলু তার মেয়ে, বয়স বার। কমলি এদিক ওদিক তাকিয়ে শাড়ির তলা থেকে একটা কাপড়ের ব্যাগ বের করে ঝটপট পাঁচ জোড়া মহিলাদের জুতো ব্যাগটিতে ভরে নিচে ফেলে দেয়। সময়মত শিলু কিছুক্ষণের মধ্যেই সরিয়ে ফেলবে ওটা। তারপর ও আবার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে যায়।
রান্না শেষ হবার আগেই একটা হৈচৈ-এর আওয়াজ হয়। পাঁচ মহিলার নতুন জুতো পাওয়া যাচ্ছেনা। দাসবাবু এদিক ওদিক খুঁজেও জুতো বের করতে অসমর্থ হন। লজ্জায় পড়েন। বলেন, ছি ছি। কাণ্ডটা কে করল ? এটা কি আমাকে বদনাম করার জন্য নয় ?
দাসবাবু বিলক্ষণ জানেন, ফ্ল্যাটের সেক্রেটারি হিসেবে তিনি ফ্ল্যাটের অনেককেই মাসিক চাঁদা সময়মত পাননি বলে কঠিন শব্দ প্রয়োগ করেছেন এবং তিনি মোটেই জনপ্রিয় নন।
এইসময় কমলি বেরিয়ে এসে বলে, দাদা আমার মজুরিটা দিন। বাসে ফিরতে হবে। রাত হয়ে গেছে। দাসবাবু তাঁর এক্স-রে চোখে কমলির শাড়ির ভেতরে জুতো খুঁজতে থাকেন। কমলি পাল্টা জিজ্ঞেস করে, কিছু দেখতে চান ? দাসবাবু উত্তর দেন, অনেক কিছু। শুনে কমলি মনে মনে বলে, শাড়িটা খুলে দিলে তুই কিছুই দেখতে পাবি না। যত্তোসব পুরুষগিরি!



ঠিকানা

ওপ্রান্ত থেকে সুরেলা এক মহিলার মিষ্টি আওয়াজ ভেসে আসে, কখন আসবো বলুন ? এপ্রান্তে রিক্সাচালক সুবলের হৃদয়টা যেন কেঁপে ওঠে। মোবাইল ফোনটাকে আরো কানে চেপে ধরে বোঝার চেষ্টা করে, সে ঠিক ঠিক শুনেছে কিনা। ওপ্রান্ত থেকে আবার একই কথার পুনারাবৃত্তি হয়। তাহলে সে ঠিকই শুনেছে। কিন্তু গলাটা তো তার ঘর পালানো বৌয়ের মত লাগছেনা। বছর খানেক আগে এক কম বয়সী একটা বেকার ছেলের সাথে পালিয়ে যাওয়ার পর তার বৌ দু-দুবার কোত্থেকে জানি ফোন করে অনুনয় করেছিল ফিরে আসার জন্যে। বলেছিল ভুল করে ফেলেছে। সুবল জবাব দেয়নি। প্রথমে পালিয়ে যাওয়ার কথা শুনে তো তার মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল।পরে সে ঠিক করেছিল বৌটাকে মাপ করে দেবে, বৌ যখন ভুল স্বীকার করেছে। সে শুধু ভেবেছিল মানুষ কেন জেনেশুনে ভুল করে। এই কেনর জবাব সে জানেনা বলেই গাঁজার টানে এক সুখ খোঁজার চেষ্টা করে। ওপ্রান্ত থেকে আবার সেই মহিলার গলা ভেসে আসে, আপনি বলেছিলেন আজ বিকেলের দিকে আসতে। বিকেল ছ’টার দিকে এলে হবে ডাক্তারবাবু ? আজ মায়ের যন্ত্রণাটা একটু বেড়ে গেছে। এবার সুবলের কাছে ব্যাপারটা সব পরিষ্কার হয়ে যায়। মোবাইল নাম্বারের ভুলে তাকে ডাক্তারবাবু বলে ভাবছেন মহিলাটি। এবার সুবল বলতে থাকে, আপনি ভুল করছেন। আমি ডাক্তার-ফাক্তার নই। দেখুন এভাবে আপনি ভুল করবেননা। ভুল মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় কেউ বোঝে না। ভুল মানুষের জীবনটাকে ধ্বংস করে দেয়। আপনি দয়া করে ভুল করবেন না। বলেই সুবল ফোনটাকে কেটে দেয়। আকাশের দিকে চায়। অনেক ওপরে এক ঝাঁক সাদা মেঘ কোথায় কোন্ ঠিকানায় জানি ভেসে যাচ্ছে।



                                                  HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]