free website design software
সদানন্দ সিংহ      

গিরগিটি 


গল্প           Home


গিরগিটিটা হাত পাঁচেক দূরে দাঁড়িয়ে পথ আটকে ঘাড় তুলে নিস্পৃহ কিন্তু স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছে । রমেনের একটু ভয় হয় । কামড়াবে নাকি ? সে ঠিক জানে না গিরগিটিরা কাউকে কামড়িয়েছে কিনা । কিন্তু কাছে গেলে ওটা নিশ্চয়ই কামড়াবে । সে হয়তো ওটাকে ঢিল মেরে তাড়িয়ে দিতে পারতো । হয়তো এটা না করাতেই ওটা তাকে কোন তোয়াক্কা না করে একটা হাই তোলে রাজকীয় ভঙ্গিমায় । তারপর তার সামনে গিরগিটিটা এক আশ্চর্য ভেলকিবাজি শুরু করে । রমেন আশ্চর্য হয়ে দেখে, গিরগিটিটা পেছনের বাঁ পা-টাকে তুলে প্রথমে একটা ঢেউ তৈরী করে । তারপর আস্তে আস্তে ওটা সারা শরীরটাকে রক্তিমাভ করে তোলে । কিছুক্ষণ পর পেছনের ডান পা-টাকে তুলে আবার আরেকটা ঢেউ তৈরী করে । আস্তে আস্তে ওটার সারা শরীর এবার সাদা ধোঁয়াটে মত হয়ে যায় । এইভাবে সামনের বাঁ পা-টাকে নাচিয়ে হলুদ বর্ণ এবং সামনের ডান পা-টাকে নাচিয়ে রুপোলি বর্ণ তৈরী করে রমেনকে তাক লাগিয়ে দেয় । তারপর রমেনের দিকে একটা ভেংচি কেটে অযত্নে ভরা বাগানের আগাছার মধ্যে সেঁধিয়ে যায় ।
রমেন অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । এই গিরগিটিদের এ্যাতো ক্ষমতা ! মুহূর্তে কিভাবে রং পালটিয়ে গেল ! ভাবনার কোন কূলকিনারা না পেয়ে সে তার নিজের ঘরের দিকে চলে যায় ।
রমেন নামক যে যুবকটির কথা এতক্ষণ বলা হয়েছে এবার তার একটু পরিচয় দেওয়া যাক । ভারতবর্ষের অন্যান্য ছেলের মতোই রমেন একজন সাদাসিদে যুবক । বয়স যার পঁয়ত্রিশ চলছে । আর কিছুদিন পরেই সরকারি চাকুরি পাওয়ার যে বয়সসীমা ধার্য করা আছে সেটাকে ছাড়িয়ে যাবে সে । চাকুরি পাওয়ার জন্যে ডানের রাজত্বে ডানপার্টি এবং বামের রাজত্বে বামপার্টি করে গেছে, কিন্তু চাকুরি আর হয়নি । সেও জানে সরকার সব বেকারদের সরকারি চাকুরি দিতে পারবেনা কোনদিনই । বাবা ছিলেন এক সরকারি অফিসের বড়বাবু, এখন অবসরপ্রাপ্ত । অবসর নেওয়ার সময় বাবা বেশ কিছু টাকা পেয়েছিলেন, কিন্তু একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে প্রায় সব শেষ । যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা তিনি ছোটছেলে অশেষকে ঠিকেদারির কাজ করার জন্যে দিয়ে ফেলেছেন । ছোটভাই অশেষ রমেনের থেকে বছর দশেকের ছোট, বি.কম. পাশ করে ঠিকেদারিতে নেমেছে । বাংলায় এম.এ. রমেনের এখনো ক্ষীণ আশা চাকুরি হলেও হয়ে যেতে পারে । হয়তো তার বাবারও এরকম একটা আশা আছে । কিন্তু হবার সম্ভাবনা খুবই কম । বেশ কয়েকটা টিউশানি করে নিজের হাত খরচটা অবশ্য চালিয়ে নেয় সে । এমন কিছু ক্যাপিটেলও নেই তার যাতে একটা ব্যবসা আরম্ভ করা যেতে পারে । ক্যাপিটেল বলতে তার কিছু ইন্দিরা বিকাশ পত্র আছে । ডান-রাজত্বে ডানপার্টি করা বাবদ ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার টাকার ঋণমেলা পেয়েছিল । ঐ টাকাটা পেয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি করে ইন্দিরা বিকাশ পত্র কিনেছিল । সাড়ে পাঁচ বছর পর মেয়াদ শেষে টাকাটা দ্বিগুণ হলে আবার সে ইন্দিরা বিকাশ পত্র কিনেছিল । তারপর আবার মেয়াদ শেষের পরে সে ন্যাশেনেল সেভিংস সার্টিফিকেট কিনে পুণর্বিনিয়োগ করেছিল । এদিকে ব্যাঙ্ক থেকে চিঠি এসেছিল । পাত্তা দেয় নি সে । যদিও সে জানে ঋণমেলা শব্দটার মধ্যে যেহেতু ঋণ কথাটা আছে সেহেতু ঐ টাকাটা কোন একদিন সুদসহ তাকে ফেরৎ দিতে হবে । বর্তমানে তাদের বাড়িতে কোন ঠিকে ঝি-ও নেই । ঘরের সমস্ত কাজ মা-ই করেন । কোন কোন সময় মা তিতিবিরক্ত হয়ে বলে ওঠেন, আর ভালো লাগে না । সব ছেড়ে একদিন চলে যাব কোথাও । রমেন জানেনা, মা আসলে ঠিক কোথায় যেতে চান ! তবে মায়ের কষ্ট সে বোঝে । চাকুরি পেলে একটা ঠিকে ঝি হলেও সে রেখে দিত । অশেষকেও যদি একটা বিয়ে করিয়ে দেওয়া যেতো । নিজের বিয়ের কথা এখন চিন্তাই করতে পারে না সে । চাকুরি না পেলে কোনদিন তার পক্ষে তা সম্ভব বলেও মনে হয় না । এমনিতে সে নিজের মা এবং বোন বাদে অন্য মহিলাদের কাছ থেকে দশহাত দূরে দূরেই থেকে এসেছে এতদিন । একটু লাজুক প্রকৃতির মানুষ সে । কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় কোনদিন কোন মেয়ের কাছে গিয়ে নিজে থেকে কথা বলতে পারে নি । অবশ্য সে মুখিয়ে থাকতো যদি কোন মেয়ে তাকে ডেকে কথা বলে । সে সুযোগ অবশ্য তার জীবনে কোনদিন আসেনি । তবে রাস্তায় হঠাৎ মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলে যখন কোন সহপাঠিনী বলে উঠতো, ‘রমেনবাবু কোথায় যাচ্ছেন ? ভালো আছেন ?’ তখন তার বুকটা যে খুশিতে ফুলে উঠতো তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা । কোন মেয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা না থাকলেও সে সেটা পুষিয়ে নিতো দিবাস্বপ্ন দেখে দেখে । এই দিবাস্বপ্নের মাধ্যমে বহু মেয়ের সঙ্গে --- সে পাড়ার মেয়েই হোক, সহপাঠিনী কিংবা মাধুরী দীক্ষিতই হোক, কতোবার কতোভাবে আলাপ থেকে আরম্ভ করে কতোকিছু যে সে করেছে তা সে নিজেও বলতে পারবেনা । ইদানীং সে সোনালি বলে একটা মেয়েকে মনে মনে ভালোবাসে । সোনালিরা তাদের পাড়ায় নতুন এসেছে এবং ও খুব সুন্দর নাচে । তার সাথে সোনালির এখনো আলাপও হয়নি । হবার সম্ভাবনাও কোনদিন আছে কিনা সন্দেহ । তবে বয়েস বেড়ে যাওয়াতে বোধহয় রমেনেরও একটু সাহস বেড়েছে । আগে সে মেয়েদেরকে আড়চোখে দেখতো । এখন সে সোজাসুজিই অনেকটা হ্যাংলার মতো মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকে । সোনালিকে দেখলে সে হাঁ করে চেয়ে থাকে এখন । কিন্তু সোনালি কোনদিন তার দিকে একপলকের দৃষ্টিতেও তাকায়নি । এইসব দেখে হয়তো সোনালির তিন বান্ধবী শ্যামলী, ইলা ও মিতু একদিন তাকে শুনিয়ে বলেছিল, তীর্থের কাক । বলেই সে কি হি হি হাসি তাদের । খুব খারাপ লাগেনি তার । মনে মনে বলেছিল সে, তীর্থের কাক হলে কাকই ।
এছাড়াও রমেন অনেক ফ্যান্টাসিতে ভোগে । ঠিক ফ্যান্টাসি নয়, বরং বলা যায় তার রোমান্টিক চিন্তাধারাগুলি একমাত্র ফ্যান্টাসির মাধ্যমেই রূপায়িত করা সম্ভব । দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক । (এক) একদিন রাত্রিবেলা সে রাস্তায় হাঁটছিল । এমন সময় তীব্র বেগে একটা মারুতি ভ্যান কিনার দিয়ে বেরিয়ে গেল । বেরিয়ে যাবার সময় একটা ঢাউস স্যুটকেস ভ্যানটার ভেতর থেকে ফেলে গেল । সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের একটা জীপগাড়িও মারুতির পেছনে ধাওয়া করতে করতে ছুটে গেল । সে স্যুটকেসটাকে বাড়িতে নিয়ে এসে দেখলো ভেতরে পাঁচশ টাকার সারি সারি বান্ডিল, প্রায় এক কোটি টাকা । সে তখন টাকাগুলি স্যুটকেসসহ থানায় জমা দিয়ে এল । তারপর একদিন পুরষ্কার স্বরূপ বিশ লাখ টাকার একটা চেক সরকারের কাছ থেকে পেল যা কিনা এক কোটি টাকার কুড়ি শতাংশ । অবশ্য পুরষ্কারের মূল্যটা সরকারি আদেশ মোতাবেক দশ না কুড়ি শতাংশ সে ঠিক জানেনা । তবে কুড়ি শতাংশ বলে ভাবতে ভালো লাগে । ( দুই ) একদিন তাদের বাড়িতেই মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে এক কলস স্বর্ণমুদ্রা সে পেয়ে গেল । ইত্যাদি ইত্যাদি । উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবেনা । তবে রমেনেরও কিছু ভালো দিক আছে । সে কোনদিন অপরাধী কাজেকর্মে নিজেকে জড়ায়নি । আর স্বামী বিবেকানন্দকে তার খুব ভালো লাগে । এছাড়া ইদানীং এক এন.জি.ও.-র পক্ষ থেকে বস্তির মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের এক কোচিং ক্লাস পরিচালনা করে । এ হেন রমেনকে এবার বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে গিরগিটিটা । ছোটবেলায় সে ভাবতো পি সি সরকারকে গুরু হিসেবে পেলে সেও যাদুকর হয়ে যাবে । তাতো আর হয়নি ।তবে এখনো মাঝে মাঝে নিজেকে যাদুকর বলে ভাবতে তার ভালোই লাগে । অন্তত যাদু দেখিয়ে কি সোনালিকে জয় করা সম্ভব হতো না ? আর গিরগিটির মতো রং পাল্টানোর যাদু যদি পারতো ! তাহলে সেও নিশ্চয়ই বিখ্যাত হয়ে যেত । অনেক কষ্টে সে অনেক তাসের খেলা আয়ত্ব করেছিল । হঠাৎ তার মনে হয়, গিরগিটির মতো চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি ? দেখা যাক না সে গিরগিটি হতে পারে কিনা । ভাবা মাত্র সে তার নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় । তার ঘরে বিরাট আয়না সহ একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ড্রেসিং টেবিল আছে । বিজ্ঞাপন দেখে সে ওটা এক মিলিটারি ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে কিনেছিল । অবশ্য ঐ ক্যাপ্টেনের ঘরে স্কুটার, টিভি, ফ্রিজ, স্টিরিও ইত্যাদি আরো অনেক বিক্রির জিনিস ছিল । সাধ্যের মধ্যে ছিল না বলে সে শুধু ড্রেসিং টেবিলটাই কিনেছিল । সে এবার ড্রেসিং টেবিলের সামনে হামাগুড়ি দিয়ে দাঁড়ায় । সঙ্গে সঙ্গেই সে একটা বিরাট পার্থক্য লক্ষ করে । গিরগিটির লেজ আছে, তার নেই ।
এবার রমেন তার বাঁ পা-টা তুলে ঢেউ খেলানোর চেষ্টা করতে থাকে । কিছুক্ষণ চেষ্টা করতেই তার মনে হয় আয়নায় তার চেহারাটা যেন রক্তিমাভ হয়ে ওঠেছে আস্তে আস্তে । আনন্দে তার শরীরটা নেচে উঠতে থাকে । হামাগুড়ি দিয়ে সে সারা ঘরময় ছোটাছুটি করে । তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গিরগিটিটার মতো অন্য পা এবং হাতগুলি নাচিয়ে সেও পরপর সাদাটে, হলুদ এবং রূপালি বর্ণ তৈরী করে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যেতে থাকে । নিজেকে মনে হতে থাকে একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির মতো । ভয় জিনিসটা তার মস্তিষ্কের সমস্ত কোষ থেকে নিশ্চিহ্ন হতে থাকে তখন । ঘরে থাকতে আর ইচ্ছে হয়না তার । চেহারাটাকে রক্তিমাভ করে রাস্তায় নেমে আসে সে ।
ভরদুপুর । রাস্তায় লোকজন কম । সূর্যের তেজটাও বেশি যেন মাথার ভেতরটাকে গোলমাল করে দিতে চায় । তীব্র কৌতূহল রমেনের, তাকে কেমন খাসা দেখাচ্ছে ! চেনা লোকজনেরা তাকে কিভাবেই বা নেবে ? এইসময় সে দেখে রাস্তার উল্টোদিক থেকে তার ছোটভাই অশেষ আসছে । সে খুশি হয় । যাক এবার তাহলে পরীক্ষা করার সুযোগ একটা পাচ্ছে । তার কেবলি মনে হয় অশেষ তাকে চিনতেই পারবেনা । প্রায় মুখোমুখি হবার পরও একসময় অশেষ তাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকে । সে আরো খুশি হয়, অশেষ তাহলে তাকে চিনতেই পারেনি ! সে পেছন ফিরে অশেষকে ডাকে, এ্যাই অশেষ, তুই আমাকে চিনতে পারিস নি ? দ্যাখ্‌ তো আমার চেহারাটা রক্তের মতো লাল দেখাচ্ছে কিনা ? অশেষ ঘুরে দাঁড়ায় । কিছুটা অবাক হয়ে অশেষ বলে, তোকে আমি চিনতে পারবো না কেন ! হ্যাঁ, রোদে হাঁটাহাঁটি করার জন্যে তোর চেহেরাটা একটু লাল দেখাচ্ছে । আমার একটু তাড়া আছে । এক জুনিয়র ইঞ্জিনীয়ারকে নিয়ে এক্ষুনি এক রাস্তার মাপজোখ করতে হবে । যাচ্ছি । অশেষ প্রায় ছুটেই বেরিয়ে যায় । অশেষের ব্যস্ততাকে তার মোটেই ভাল লাগেনা । কেবল মাপজোখ, হিসেব, বিল আর ধরাধরি । অসহ্য ।
রমেন এগোতে থাকে । একটু এগোতেই সে দেখে সোনালি আর তার তিন বন্ধু শ্যামলী, ইলা, মিতু রঙিন ডানা মেলে প্রজাপতির মতো এগিয়ে আসছে কবিতার ছন্দে । খিলখিল হাসি, মাথার ওপর রঙিন ছাতা, ঠিক যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোন পরীর দল । সে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং হাঁ করে সোনালিদের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ভাবতে থাকে রক্তিম বর্ণে রঞ্জিত বলে তাকে নিশ্চয়ই ওরা এখন চিনতেই পারবে না । এই ফাঁকে সে সোনালির সৌন্দর্য চাটবে । সে সোনালির পা দু’টোয় নুপুর খোঁজার চেষ্টা করে । তারপর তার দু’চোখ পা থেকে হাঁটু, হাঁটু থেকে কোমর, কোমর থেকে পেট, পেট থেকে বুক, শেষে বুক থেকে সোনালির দু’চোখে গিয়ে যখন তার চোখ পড়ে তখন সে দেখে সোনালির দু’চোখ থেকে আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে । এই প্রথমবার সোনালি তাকে দেখছে মুখোমুখি এবং তা আগুন দৃষ্টিতে । পাশ থেকে আওয়াজ আসে, তীর্থের কাক এবং সোনালির বন্ধুদের হি হি হাসি । সে বেশ বুঝতে পারে ওরা তাহলে তাকে চিনতে পেরেছে । সঙ্গে আয়না নেই, তাই সে বুঝতে পারেনা রক্তিম আভাটা হারিয়ে গেছে কিনা । সোনালি কিন্তু হাসে না, সে রমেনের ওপর থেকে দু’চোখ সরিয়ে নেয়, তারপর রাস্তায় এককোণে থুঃ করে থুতু ফেলে । দুম করে যেন রমেনের বেলুনটা ফেটে যায় । সে কুঁকড়ে চুপসে যেতে থাকে । সোনালি কি তাকে ঘেন্না করে ? অপমানে তার কাছে দিন ও রাত্রির প্রভেদ এইমুহূর্তে এক হয়ে যায় । ধরণী যদি ফাঁক হতো তাহলে সেও হয়তো সীতার মত আত্মবিসর্জন দিয়ে ফেলতো । কিন্তু ধরণী আর ফাঁক হয়না । ফলে সে অনেকটা হাতড়িয়ে যাওয়ার মতো করে তার ঘরের দিকে ফিরে যাবার চেষ্টা করে । সোনালিরা কখন যে চলে গেছে সে টেরই পায় না । তার মাথার ভিতরে এখন কুমেরুর বরফ । সে চিন্তাশক্তিরহিত ।
ঘরে ফিরে সে বহুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে । ঘড়ির কাঁটার দিকে তার আর খেয়াল থাকে না। ক্রমশ তার সমস্ত চিন্তা রাগ হয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে । তাকে কেন ঘেন্না করবে সোনালি ? কেন ? কেন ? কেন ? সোনালির ওপর তার সমস্ত রাগ আছড়ে পড়ে । তার কেবল মনে হতে থাকে সোনালিকে একটা শাস্তি দেওয়া দরকার । হ্যাঁ, এমন শাস্তি যা সে জীবনে কোনদিনই ভুলতে পারবে না । সে ঠিক করে রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে গিরগিটির মতো হয়ে যাবে । নিজের রং পালটে নেবে । তারপর সোনালিদের বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে কোন গাছে উঠে যাবে । গাছ থেকে ছাদে । ছাদ থেকে সোনালির ঘরে । সোনালির নিজস্ব ঘর কোনটা সে জানেনা, কিন্তু ঠিক খুঁজে বের করে নেবে সে । তারপর সোনালির দরজা ভেঙে সে ভেতরে ঢুকবে । ঢুকেই সে সোনালির হাত-পা-মুখ সবই বেঁধে ফেলবে । তারপর একটানে ওর সমস্ত কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলে ওর ওপর পাশব অত্যাচার চালাবে । আর যদি চিনে ফেলে ? তাহলে ওকে দু’হাতে গলা টিপে ---
--- রমেন । তুই আজ পড়াতে যাস নি ? পাঁচটা বাজে যে । মায়ের গলা শুনে চমকে ওঠে রমেন । সে দেখে তার সমস্ত শরীরটা ঘামে ভিজে গেছে । --- ও কি, তুই এমনভাবে চমকে উঠলি কেন! শরীরটাও দেখছি ঘামে ভিজে গেছে। কিছু হয়েছে ? --- না না মা । কিছুই হয়নি । একটু অন্য চিন্তায় ব্যস্ত ছিলাম । আমি এক্ষুনি বেরিয়ে পড়বো । একটু চা করে দেবে মা ? বলেই রমেন একটা কাষ্ঠ হাসি হাসার চেষ্টা করে । --- বাজে চিন্তা একদম করিস না । আমি চা করে আনছি । মা চলে যান ।
রমেন ধীরে ধীরে আবার বিছানার ওপর বসে পড়ে । সত্যিই এতক্ষণ সে বাজে চিন্তাই তো করছিল । শুধু বাজে চিন্তাই নয়, জঘন্যতম । এবার নিজের ওপরই ঘেন্না ধরে যায় তার । সে কিনা এক পশুতে পরিণত হতে যাচ্ছিল ! সে কিনা একজন খুনীতে পরিণত হতে যাচ্ছিল ! ছিঃ ছিঃ । সে কিনা এক অমানুষ হয়ে যাচ্ছিল ! নিজেকে এখন গিরগিটি বলে ভাবতে তার ঘেন্না হয় । সেই গিরগিটিটার ওপর তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে । তার মনে হতে থাকে ঐ গিরগিটিটার জন্যেই যত সব গন্ডগোল । সে একটা দা নিয়ে গিরগিটিটা যেখানে লুকিয়ে পড়েছিল সেখানে গিয়ে আগাছা সাফ করতে থাকে । আস্তে আস্তে সমস্ত আগাছাই সাফ হয়ে যায় । কিন্তু সে আর গিরগিটিটাকে খুঁজে পায় না । ক্লান্ত হয়ে হাঁপায় সে । ঘরে ঢোকে । চেয়ারে বসতে গিয়ে তার কেবল মনে হতে থাকে তার মাথার ভেতরটাও যেন আগাছাতে ভর্তি । সে তখন দা দিয়ে চেঁছে চেঁছে মাথার ভেতরের আগাছাগুলিও সাফ করতে থাকে । সাফ করতে করতে সে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, সোনালি, আমি লোকটা ঠিক খারাপ নই । নিজেকে আমি একজন ভালো লোক বলেই মনে করি । হয়তো অনেকেই করেন । তবে আমি একটু আলাদা ধরনের । আমি এক বিশ্বজনীন চিন্তাধারায় বিশ্বাস করি । আমি বিশ্বাস করি ভ্রাতৃত্ববোধে । মানবতাকে আমি ভালোবাসি । গভীরভাবে । বুঝতে চাই বাস্তবতাকে, সঠিকভাবে । তাই, আর তাই তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম সোনালি । হয়তো আমার এই ক্ষমার কোন গুরুত্বই নেই তোমার কাছে । তবু তুমি বেঁচে থাকো হাজার বছর ।


                                                       HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]