best web design software for mac

মুক্তগদ্য        Home      
অরুণিমা চৌধুরী


বাজার

বাজারের বুকের উপর দিয়ে আসি যাই, কিন্তু ঘর বসত করিনা বহুকাল। বাজারটি বেশ স্বতন্ত্র। স্প্লিট পার্সোনালিটি বলবো কি? ছড়িয়ে ছিটিয়ে খন্ড খন্ড বিছিয়ে রেখেছে নিজেকে। এদিকে মাথা, ওদিকে ধড়, মাঝখানে বুকের উপর ইদানীং বড্ড শোক তাপ, বেহায়া কন্ট্রাক্টর দিন নেই, রাত নেই, কম সে কম হায়া লজ্জা,..তাও নেই। সামান্য ঘেরাটোপ অবধি সেভাবে রাখেনি, খুঁড়েই চলেছে, খুঁড়েই চলেছে, আর এদিকে ওদিকে খাম্বা, সিমেন্ট, বালির বস্তা...।
পাশ দিয়ে যাই, আর আড়ে আড়ে তাকাই, ওর ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে, ওয়াক্সিং পেডিকিওর, ম্যানি কিওর..আহা, রূপসী হচ্ছে, হোক, তাই বলে কি যন্ত্রণা নেই!!
সে যাইহোক,মাথা বুক এড়িয়ে চলি যার, তার পায়ের পাশেই আমার যাতায়াত সীমাবদ্ধ, ওই যে বললাম, আসি যাই, আড়ে আড়ে তাকাই, তবু ঘর বসত করিনা বহুকাল..
সক্কাল সক্কাল তবু সেই যেতে হল আজ। তাও আবার যেখানে সেখানে নয়, আমিষ গন্ধ মেখে মুখপুড়ি ইশারা করে বড় বড় খাঁচা, দড়ি বাঁধা, ঝুড়ি ভর্তি আঁশটে নিয়ে..আমি এড়িয়ে চলি,পায়েপায়ে সরে সরে চলি, তবু সক্কাল সক্কাল..খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়াই..নিজের খাঁচার ঘেরাটোপ ছেড়ে আঁশ থলি হাতে..আর মনে মনে বিড় বিড়... উদ্ধার করি নির্লিপ্ত ঘুমিয়ে থাকা লোকটার তস্য চোদ্দগুষ্টি। দেখলেই রাগ হয়, আঁশ খাবে, আঁশ মাখবে, গন্ধ নেবে, অথচ.. আঁশঝুড়ি সামলানোর দায় এই নিরামিষ আঁশটে মহাশয়ার।
তো, যা বিপদ, সেতো সক্কাল সক্কালই হয়,যা কিছু এড়াতে চাই, তাই কপালে এসে জোটে..।
খাঁচার ভিতর বিস্তর সাদা..সুগুণা..কী গুণ,দাদাই জানেন, আমি জানিনা..জানিনা তো কতো কিছুই!..ঝটরপটর ডানার নীচে কতোখানি ভয়,নিক্টিটেটিং মেমব্রেন শেষবারের মতো নেমে আসার আগে ঠিক কতোখানি দাম, তুচ্ছ ব্রেস্টপিস, লেগ পিসের...। জানিনা, কতোতে বিকোয় সর্বগুণ সম্পন্ন সাদা সুন্দরীরা..। তাই ভিতরে বুজবুজ করে ওঠা একটা রাগ, কষ্ট, ভয়, বিরক্তি নাকি অসহায়তা চেপে পরম বিজ্ঞের মতো দর হাঁকি মাংসের,
"দাদা,কতো চলছে!"
আর আমার সেই অসাধারণ সুপার ইম্পোজিং ক্ষমতা সম্পন্ন চোখে কার কার যেন মুখ ভাসে..কার কার কার!!চিনবো না, চিনবো না, চিনতে চাইনা।
মাংস, মাংস..কাটা না গোটা..ব্রেস্ট না লেগ।বড় চাঙ্ক,না ছোট কিউব..। মাংস তো মাংস..সাদাটে চর্বি, জমাট কালো রক্তের ডেলা,লালচে গোলাপি পরতে পরতে সাজানো.. হাল্কা মশলায় সাঁতলে পাতলার উপর ছেড়ে দাও, নয়তো, ঝাল মশলা, তেলে রগরগে রঙিন রোগন জ্যুস..মোদ্দা কথা তো সেই চপার, সেই নির্মম হাতে ছিঁড়ে ফেলা ছাল চামড়ার যাবতীয় আঁশটে আহ্লাদ!
দাদা দর হাঁকেন, আমি দর কষাকষি করি, আর প্রবল উগড়ে আসা পোয়াতিকালে ওড়না চেপে ধরে মুখ ফিরিয়ে রাখি। খাঁচার ভিতর আমার ডানা চেপে ধরে নির্মম একটা হাত, কঁকিয়ে উঠি, কঁক কঁক..হাত টা মাথায় মুগুরের বাড়ি মারে..আমি শেষবারের মতো দেখি বঁটির সামনে অসংখ্য সুগুণা,..পালক টালক, ছাল, চামড়া, নাড়িপোঁটা,আর যা যা সাধারণত দৃষ্টিগোচর নয়..আমার নিক্টিটেটিং মেমব্রেন নেমে আসে, উগড়ে আসে পোয়াতিকাল..উল্টো দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই..দেখি মুণ্ডহীন ঝুলে আছে আমার বন্ধুর মৃতদেহ.. কাটা গলা থেকে টুপিয়ে নামছে এক ফোঁটা, এক ফোঁটা উদ্বেগ, আর তার ঠিক নীচে খ্যাংটা সমাজ বসে বসে রেলিশ করে চাটছে আর দিব্বি টুঁই টুঁই করে লেজ নাড়ছে। ঝুলন্ত বন্ধুর দর হাঁকে দোকানী, "কি বৌদি, নিয়ে যান এক কেজি!"
আমার আবার মনে পড়ে, ট্রলি, সিডেটিভ, অক্সিজেন আর নানা রকম নলের ভিতর শান্ত থিতিয়ে আসা.. হাত দেখা যায়, পা দেখা যায়, মুখ দেখা যায় না এক সুগুণার কথা। প্রাণপণ দেখতে চাইছে চপার টা কেমন, কোন অস্ত্রে কেটে ফেলা হবে নারীত্ব.. মুখে মাস্ক গুঁজে দিয়ে, ঘাতক স্প্রে করে, অথবা মাথায় মুগুরের বাড়ি, যাইহোক, ..ব্যাপার তো সেই একই..
"বৌদি!ও বৌদি!শরীরখারাপ লাগছে? আপনি কেন আসেন রোদের মধ্যে!"
নাহ, ঠিক আছি। ঠিক আছি। ফিরে আসি মুখপুড়ির বুকের ভিতর দিয়ে আঁশজল, রক্ত আর পোয়াতিকালের নিদারুণ উগড়ে আসাটুকু সম্বল করে, থলি ভর্তি গোলাপি আমি'কে মশলায় জারাতে হবে না! খাঁচায় ফিরতে হবে না! বাদবাকি মাংসের সুরুয়ায় রাতের রুটি ডুবিয়ে তস্য চোদ্দ পুরুষের নাতির কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় পরিতৃপ্ত করার জন্য কখন ডানা মুচড়ে টান পড়ে আবার...

   
                                                             HOME

         (এই লেখাটি শেয়ার করুন)