best site builder

কবিতা            Home        
কল্যাণব্রত চক্রবর্তীর চারটি কবিতা



কে আছে আশেপাশে

এ ঘোর সন্ধেবেলা তোমাকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে
এমন কেঊ আশেপাশে নেই, কমবয়েসী নার্স বারবার
কপালে হাত রেখে বলছে, বলুন না কি কষ্ট, শীত হিম ?
এপাশের জানালা বন্ধ করে দিই ? বারবার কেঁপে উঠছে
ঠোঁট, আমায় কিছু বলবেন ?

বলা খুব দরকার ছিল তবু আর বলা হবে না,
শুনে বুঝবে তেমন আর কে কোথায় ! কথা স্মৃতি হয়,
স্মৃতি নির্জনতা খোঁজে, চাপা নৈঃশব্দ্য হালকা আঁধারে
জলখেলা খেলে ফিরে যায় শুধু শুধু –
হাসপাতালের ঘরে একা শুয়ে থেকে এসব কথা
কাউকে বোঝানো যাবে না

কেবল নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া; কে কি ভাবল
বাকি জীবন সেসব কথা নিয়ে আর কী হবে !



রাজার মতো প্রেম

ব্যাবিলনের রাজা এক ভিখিরি মেয়েকে ভালোবেসে সিংহাসন
ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। মুরারী স্যার ইস্কুলের ক্লাসে
আমাদের পড়িয়েছিলেন, বেল্‌সাজার দি কিং অব
ব্যাবিলন। প্রেমের মহিমা বোঝার সঠিক সময় না
হলেও নিখিল চৌধুরী হঠাৎ দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিল,
এ বৃত্তান্ত জেনে আমাদের কি লাভ হল ?

ছেলেবেলার ছনের পাতায় ছাওয়া স্কুলঘর ভেঙে গিয়ে
সেখানে এখন বিশাল শপিংমল মাথা তুলেছে,
একটি দোকানে দিনরাত শুধু হিন্দি ছবির গান হয়,
কেক-রুটির দোকানের সামনে কাকের দল
বসে থাকে অধীর অপেক্ষায়; এরা কখনও
ব্যাবিলনের গল্প শোনেনি, ছিন্নমূল স্বপ্নগুলি
উধাও নদীর শিকড়ের ভাঁজ আগলে থাকে,
তাও কি জানে ?

নিখিলকে আমি স্বপ্নে দেখেছি ঠিক আগের মতো
এমনিতে বহুকাল দেখা নেই। শুনেছি, দক্ষিণ
জেলা শহরে রানিবাগ আশ্রমের কাছে থাকে কোথাও।
আগে দেখলে এড়িয়ে যেতাম, কারণ দেখা হলেই
বিরামহীন দুঃখের কথা বলত, নিখিল এখন আসলেই
দুঃখী, স্ত্রী নেই, বড়ো মেয়েটি কালব্যাধি নিয়ে চলে গেছে;

শহরের খালি জায়গায় ফেলে রাখা নানা মাপের পাইপের
ভেতরে সোজা হয়ে শুয়ে থেকে কত মানুষ দিন কাটিয়ে দেয়,
হিসি করা কাঁথার মতো অশ্রাব্য জীবন;

ব্যাবিলনের রাজার মতো প্রেম নেই বলে শুধু সুখী হতে চেয়ে
আমরা লোক হাসিয়েছি।



দাহপর্ব

দাহ শেষ করে জাতীয় সড়কে উঠে এলেন রাজপুত্র, সবার
অজান্তেই মেঘে ঢেকে গিয়েছিল আকাশ, সন্ধ্যা নেমে আসছিল
অন্য সবদিনের মতো। অন্তঃপুরের লোকজন, আত্মীয় ও শুভার্থীরা
বিষণ্ণমুখে হেঁটে যাচ্ছিলেন রাজকুমারের পাশাপাশি। সোনালি
কাজ করা বাসন্তী রং-এর বিশাল ছাতা কে একজন ধরে রেখেছিল;

রাজবাড়ির চূড়া থেকে আগেই নামিয়ে আনা হয়েছে
যুগল সিংহখচিত পতাকা; আদালত, আপিস, বেণুবন ও বিদ্যালয়
দুপুরের আগেই ছুটি হয়ে গিয়েছিল।

শহরতলির কিশোরী ব্যাগ হাতে রেশন নিতে এসেছিল, দোকান
বন্ধ। ভাবল খানিকটা আটা কিনে ফিরে যেতে মৃত রাজার
অন্ত্যেষ্টির আয়োজন কিছু দেখে যাবে;

রাজার বাগানে ঢুকে পড়া মোটেই সহজ কাজ নয়, কেবল
সম্ভ্রান্ত মানুষজনই ভেতরে যেতে পারেন। মন খারাপ মেয়েটি
বুড়ো বাউলের গলায় দেহতত্ত্বের গান শুনল।

দরজা খোলা ফেলে চঞ্চল সময় ছুটছে হরিণীর মতো,
কে কার প্রজা, তবু অগণিত নরনারী দূরে দাঁড়িয়ে শেষ কাজ
দেখল, টিভিতে দেখানো হচ্ছিল বেলা শেষে ভাঁজ করা দিন;

সে কিশোরী কিছুই বলে না শুধু আঙুল তুলে দেখায়,
চরাচর বর্ষাঋতু হয়ত কোনও অমোঘ ভাঙন আমায়
বোঝাতে গিয়ে শুধু ঠোঁট কেঁপে ওঠে, লালা ঝরে,
শেষ হলে এখন আর কেউ উঠে দাঁড়ায় না, কাঁদে না কেউ।



খোঁজ

শহরের এসব অঞ্চল আমার বেশ চেনা এখন শুধু দূর
মনে হয়। পথঘাট নদী মানুষ এখানে এসে সবাই ভাগ
হয়েছে।

চৌমাথায় দাঁড়িয়ে সাদা ট্রাফিক পোস্ট, অকারণ জনস্রোত
পেরিয়ে মতিবাবুদের পুরনো দোকান ছিল। আমার কলেজের
সময়ে বন্ধু বিচিত্র দোকানের চেয়ারে বসে দিনরাত অনর্গল
চা খেত, আর কঠিন সব অংকের মীমাংসা খুঁজে বেড়াত,

ভার্সিটির শেষ ফল বেরোবার আগে কোথায় চলে গিয়েছিল খোঁজ
নেই। শেষে কাশীতে গিয়ে দেখা, মুণ্ডিত মাথা খালি পা
গেরুয়া বাস, বলল ভিক্ষে করা ছেড়ে দিয়েছি।
সাধু মহাত্মারা আজকাল খুব ইংরেজি শিখতে চান বিদেশে
যাবার তাগিদে, ওখানে কত ম্যাজিক, তাই না ?
পড়িয়েই আমার হয়ে যায়।

এখনো জল নিয়ে পদ্য লিখিস? জেগে থাকতে হলে
আগুন জ্বালিয়ে রাখ্।

কোলকাতায় যাই ঠিকই, দেশপ্রিয় পার্কে যে বন্ধু থাকে, ৪০ বছরে
একবারও দেখা হয়নি। শুনেছি তারও আশেপাশে নানা
রেলপথ, পলেস্তারা খসে যাওয়া ছায়াবাড়ি প্রমোদ কানন
অস্পষ্ট আঁধারে কেউ ঘন্টি বাজিয়ে চলে যায় –

চমৎকার খুঁজে ফেরা টোল খাওয়া চৌষট্টি গলিতে আঁকাবাঁকা,
নীরস শপিংমল রঙিন প্যাকেটে মোড়া হাহাকার,
এখানে বাড়িঘর নেই কারো, কিসের ঠিকানা,
সোজা এজরা স্ট্রীটে চলে যান, ওখানেই আলোর সরঞ্জাম
যা কিছু পাবেন।


                                                  HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]