web page creator
নকুল রায়      
আলো ফিরে আসে


গল্প           Home

হেমন্তের সন্ধে। দিগন্ত-ছোঁয়া বিশাল মাঠের ওপারে ছোটো ছোটো চালাঘরের ফাঁকে মাটি ছুঁয়ে কুয়াশা ধোঁয়াশার মতো জটলা বেঁধে আছে।
তিমিরকে শহরের বাসে তুলে দিয়ে আলো ফিরে আসে। ওর দু’চোখে অশ্রু, সুতোর মতো নেমে এসে গলা থেকে বুকে মিশে যায়। বাসে তুলতে যাওয়ার সময় একটু অন্ধকারে হঠাৎ তিমির দু’হাতের তালুতে শঙ্খধ্বনি করার মতো আলোর মুখ টেনে নিয়ে ঠোঁটে চুম্বন করে।
আলোর শরীর কেঁপে উঠে, তিমির টের পায়। এই প্রথম প্রেমের চিহ্ন পড়ে দু’জনের ঠোঁটে। তারপর দু’জনের দু’দিকে ফিরে চলা।
তিমির বাসে ওঠে। আলো পায়ে হেঁটে।

দু’বছরের প্রেম। তিমির এবছর শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে সাব্রুম পোস্টিং। রাতে বিশালগড় নিজ বাড়িতে থাকবে। পরদিন চলে যাবে সাব্রুম। আলোর সঙ্গে সারাদিন থেকে সেই সন্ধেয় ওদের জীবনের দু’বছরের প্রথম চুম্বনের সাড়া ও দাগ। এই সম্পদ নিয়ে তিমির বাসে ওঠে।

বহুদূর থেকে দেখা যায় মাঠ। ডানদিকে আদিগন্ত মাঠ, ধানের জমি; বাঁদিকে সোজা চলে গেছে পিচের সড়ক কল্যাণীর দিকে। কল্যাণী আগরতলার শহরতলি। শহর এখন ক্রমশ বড় হচ্ছে। আগে যেসব জায়গায় শেয়াল ডাকত রাত্রিনিশীথে, এখন ইয়ামাহ-হোন্ডার গর্জন শোনা যায়। মেয়েরা হাফ লং প্যান্ট জিন্সের, হাঁটুর ঠিক নিচে ভাঁজ করা বা স্বেচ্ছাকৃত ছেঁড়া স্টাইলে এবং হাওয়াই শার্ট অথবা হাফ শার্ট পরে কল্যাণীর পিচঢালা রাস্তা জুড়ে সকাল-সন্ধে কলকল করে হেঁটে চলে।
পৌরাণিক রাস্তা ধরে আধুনিক হাঁটাচলা ও পোশাক, চিরকালই তারুণ্যের আধুনিক জয়যাত্রায় ফ্যাশান সূচিত করে।
আলো মনে আধুনিক হলেও পোশাকে সাধারণ। কলেজে এবার থার্ড ইয়ার। গোলাপি সাদা সালোয়ার কামিজ কলেজের পোশাকটি ছাড়া অন্য সবসময় শাড়ি। তাঁতের হলেই বিশেষ পছন্দ।
মাঠের উপর দিয়ে মৃদু ঠান্ডা বাতাস মসলিন কাপড়ের মতো তার নাকেমুখে উড়ে এসে ছুঁয়ে গেল হঠাৎ।
তিমিরের সরল মুখটা মনে মনে বোধহয় হৃদয় তন্তুজালে বুনে চলছিল; হঠাৎ বাঁদিক থেকে একটা মারুতি এসে তার শরীর ঘেঁষে, মুখ চেপে শক্ত কতগুলি হাত চলতি গাড়ির দরজা থেকে বেরিয়ে তাকে টেনে তুলে নিয়ে দ্রুত রাস্তাটা পেরিয়ে গেল। পথে কোন মানুষ ছিল না অন্ধকারের এই ১০০ হাত জায়গাটিতে; কোনও বিদ্যুতের খুঁটিও নেই এখানে; কোনও স্টেশনারি বা চা-পান-সিগারেটের স্টল নেই , এবং আশ্চর্যের ব্যাপার পাশের বাড়িগুলিতে আলো জ্বলছে। প্রাচীর দেয়া দুটো বাড়ির লোহার গেট পাশাপাশি যেন শয়তানের মতো নিশ্চুপ দুষ্টামির খাতা খুলে দাঁড়িয়ে আছে; অর্থাৎ অন্যদিন দুজন প্রহরীও থাকে সবসময় এই দুটো বিশেষ ফটকওয়ালা বাড়ির সামনে; আজ শুধু বসার টুল দুটো পড়ে আছে সেখানে; নির্জন দুই টুল যেন পার্শ্ববর্তী পড়োশিদের আসার অপেক্ষায় নিজেরাই মসৃণ কাঠের সেতু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মূক।


গতবছরই হেমন্তকালে রাত দশটায় আগরতলায় এক ভয়ানক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল। চারটে তরুণ বাইকচোরকে শত শত মানুষ সমবেতভাবে ধাওয়া করে পিটিয়ে মেরেছিল যেহেতু তারা একটি মোটর বাইক বাড়ির গ্রিল ভেঙে বের করার মুহূর্তে বাড়ির মালিক জেগে চিৎকার করে তোলপাড় করেছিল পাড়া; এবং বহু মানুষ জানত এই বাড়ির মালিকটি ঘুষখোর লম্পট মাতাল, তা সত্ত্বেও চিৎকারে পাড়ার মানুষের মনে সাধুতার উদয় হয়েছিল বোধহয় এবং সেইসঙ্গে তাদের ভেতর সুপ্ত জিঘাংসা প্রবৃত্তিও একই সঙ্গে জেগে উঠেছিল বোধহয় ---- শত শত, এমনি দেখতে নিরীহ হলেও তারা যে সময়ে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে মানুষ খুন করতে পারে; তা এই আগরতলা শহরের কারোরই জানতে আর বাকি থাকল না।
একটি চোর সেদিন সেই দলে যোগ দিয়েও আর শেষপর্যন্ত গ্রিল ভাঙার সময়টুকুতে থাকেনি; সে দিগন্ত বিস্তৃত ওই মাঠের একধারে বসে; দূর থেকে শত শত মানুষের চিৎকার আর প্রহারের অনুবাদ তার মস্তিষ্ক ও বুকের মধ্যে জমা হচ্ছিল।
সে ফিরে যাবে এই মাঠ পেরিয়ে অন্ধকারের ভেতরে; সে মাঠের ভেতর দিয়ে চুলের সিঁথির মতো পায়ে চলা পথটির আবছা দাগের উপর পা ফেলে পকেট থেকে একটিমাত্র চারমিনার সিগারেট বের করে ডান পকেটের ভেতর দেশলাইয়ে হাত রাখে, কিন্তু দেশলাইটি বের করে না।
তার কানে ঢোকে মৌমাছির গুঞ্জনের মতো কিছু শব্দ; এই নির্জন নিঃশব্দ প্রান্তরের অদূরে ঝোপের সঙ্গে লেগে থাকা উড়ন্ত অসংখ্য জোনাকির আলো, যেন তেল ফুরিয়ে আসা পেট্রোম্যাক্স লাইটের মৃদু সাদা আলো ছড়িয়ে থাকতে দেখেও আলাদাভাবে কখনও মৌমাছির গুঞ্জন, তারপর কখনও ভোমা গুড্ডির মতো বহুদূর রাতের আকাশ থেকে নেমে আসা শব্দ-তরঙ্গ মনে হচ্ছে; সে থমকে দাঁড়ায়।
এই তরুণ বাইক চোরটির মন এক্ষণ, ঠিক যেভাবে গ্রিল ভেঙে বিশেষ পদ্ধতিতে বোবা বাইকের তালা খোলে অথচ গৃহকর্তার নিঃশ্বাস-প্রঃশ্বাসের শব্দও যেসময় শুনতে অভ্যস্ত, সেই মুহূর্তটির চেয়েও তীক্ষ্ণ অনুভব ক্ষমতার জোরে সে শব্দের উৎস খুঁজতে থাকে। এবং এই মুহূর্তেই তার সিগারেটটি খাওয়ার পিপাসা পেল। কিন্তু সে দেশলাই পকেট থেকে বের করেও জ্বালল না। তার মনে হল, দেশলাই জ্বালালে দূর থেকে আগত চোর ধাওয়াকারী মানুষগুলো কেউ না কেউ তার অস্তিত্ব টের পেতে পারে; অথবা সে যে অপরাধী, একজন মার্কামারা বাইকচোর, বিশেষ করে থানায় যার ছবি আছে, হয়তো বা আরেক রকমের ভয়, যার চেহারা সে এখনো দেখেনি, একথা ভেবে সে সিগারেট ধরাল না। আগুনহীন সিগারেটটি সে ঠোঁটে ঝুলিয়ে ব্যর্থ ধোঁয়া টানার মতো করে টানতে টানতে শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে গেল।
সে এরকম সেন্সেটিভ তরুণ মোটরবাইক চোর, যার সঙ্গে তুলনা চলে একজন প্রখর তীক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন বুদ্ধিমান গোয়েন্দা অথবা গুপ্তচরের। তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, সে মনে মনে ঠিক করতে পারে, যতই বুদ্ধিমান হোক প্রতিপক্ষ বাইক চালক, তার বাইকটি সে চুরি করবেই যদি ইচ্ছে করে। তারপর সেই মোটর বাইকের ইঞ্জিনটি যথেষ্ট দামে বাংলাদেশে পাচার করে দেবে। বাংলাদেশে মোটর চালিত নৌকোর জন্যে ইয়ামাহ বা এদেশের মোটর বাইকের ইঞ্জিন অত্যন্ত জুৎসই। এর জন্যে তার পারাপারের লোক আছে।
এখন সে বুঝতে পারছে, দূর থেকেই সে অনুভব করতে পারছে যে, যে চারজনকে রামনগরের বাড়িতে সে গ্রিল ভেঙে বাইক চুরি করতে পাঠাল, তারা হয়তো নাও ফিরতে পারে। পালিয়ে আসার সময় চলে গেছে। হয়তো চারজনকেই পাড়ার মানুষ ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে ; রামনগরে ঘনবসতি অঞ্চলে তার সম্ভাবনা বেশি। 
সে চারমিনারটি অবশেষে আলো আড়াল করে ধরাল। মুখ ভর্তি ধোঁয়া নাক দিয়ে ছাড়তেই সে টের পেল, সামনে একটি মানুষ পড়ে আছে। সে দুহাত হাঁটুতে ভর করে মাথাটা নোয়াল। তারাভরা হেমন্তের আকাশ থেকেও যে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের ওপর আলো পড়ে , তাতেই সে চমকে ওঠে।
মেরুদণ্ড বেয়ে নামল কোন ভয়ের স্রোত নয়, একটা দুঃখের নদীর স্রোত যেন ইলেকট্রিক তারের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের মতো নেমে গেল সহসা। শরীরটি নারীর। চিৎ, দুই হাত বাঁধা, দুই খোলা ঊরুর উপর দুই হাতের তালু দিয়ে ঢেকে রেখেছে তার যোনি। শাড়ির প্রান্ত মাটি-ঘাসের উপর বহুদূর মনে হয় কেউ টেনে নিয়ে গেছে। ঠিক, একটি কুকুর।
সে কুকুরটিকে মাটির ঢেলা ছুঁড়ে তাড়া করে।
চোখ দুটো বাঁধা। মাথার পিছনে গিঁট। দুই খোলা স্তন থেকে যে আলো আসছিল তা হেমন্তের তারাভরা আকাশের নিচে যে কোনও মাংস বিক্রেতা বা স্বভাব কসাইকেও প্রলুব্ধ করবে। কিন্তু সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। কারণ তার ছোটো বোনটিও গত বছর দশমীর রাতে এমনি করে এই মাঠেই ধর্ষিতা হয়েছিল; দুদিন বাদে সে আত্মহত্যা করে।

বহুদূর থেকে তখনও ভেসে আসছিল আর্ত চিৎকার, হৃদয় বিদারক চিৎকার ‘বাঁচাও বাঁচাও!’ ‘ধর মার, মেরে ফেল।‘ ঢিল লাঠিসোটায় প্রহারের এক নারকীয় কোরাস। মানুষ মারার কোলাহল এত কর্কশ হয়, এটা যেন সে এই প্রথম টের পেল।
সে ফেলে দেওয়া সিগারেটের জ্বলন্ত শেষ অংশটা খুঁজছিল। এদিক ওদিক কোথাও খুঁজে পেল না সে। সে একটু ভেবে নিল খোলা জোড়া নগ্ন স্তনের দিকে তাকিয়ে। ঠিক তখনই দুটো ইন্দ্রিয়ের কাজ একই সঙ্গে সে অনুভব করল। তিমির…তিমির…তিমির… বলে ডাকছে মৃদু কন্ঠে, শব্দগুলো দিগন্তের বিছানো প্রান্তর থেকে ভেসে আসছে, আর দ্বিতীয়টি হল পোড়া গন্ধ। সে কানের কাছে ঝুঁকে জিঞ্জেস করতে যাবে --- কী নাম, কোথায় থাকে, সে সময়েই সিগারেটের শেষ অংশটা সে দেখতে পেল তার দুই স্তনের মাঝখানের উপত্যকায় শুয়ে আছে। সে স্তনের ছোঁয়া বাঁচিয়ে সিগারেটের টুকরোটা নিয়ে ফের ঠোঁটে রেখে জ্বালাল, আর লক্ষ করল এবং বুঝতেও পারল যে আগুনটি নিভেছে তার বুকেই, তার ঘামে।
সে ঠিক করে ফেলে সিগারেটে ক’টান দিয়েই। শেষতম অংশটি যা আঙুল সহ্য করেছে না আর, ফেলে দিল।খুব দ্রুত নরম স্পর্শে মাথাটা ধরে বললে, দিদি, আপনে আমারে বিশ্বাস করেন।
এই বলে সে মাথাটা কাত করে চোখ বাঁধা কাপড়ের গিঁট খোলে। হেমন্তের রাত, তারার আভায় সে দেখতে পায়, মেয়েটি তার দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে।
সে এবার জিজ্ঞেস করে, আপনে থাকেন কই ?
আলো দুই বাঁধা হাত উপরে তুলে দক্ষিণ কোণের দিকে দেখাল। বলল বাড়ি ও ঠিকানা।
সে চিনতে পারে। বেশিদূরের রাস্তা নয় আলোর ঠিকানা। খুব আস্তে আস্তে বলল, আমার নাম আলো। কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ি। আপনি যে ভালো, আপনার হাতের ছোঁয়াতেই বোঝা গেছে।
অন্ধকারে সে আলোর মুখ যতটা ভালো পড়তে পেরেছে, এর চেয়ে বেশি পরিমাণে সে নিজেকে পড়তে শিখল যে, জগতে এমন নারীও আছে, যার কাছে বিশ্বাস হারানো পাপ।
--- আপনি আমাকে এক বালতি জল এনে দেবেন? আমি সব ধুয়ে নেব তারপর বাড়ি যাব।
আলো চিৎ হয়ে আগের মতোই শুয়ে থাকে নির্জন মাঠের উপর। সে দেখে, আকাশ এত নির্মল, ধ্রুবতারাটি এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল ---- ওইদিকে মন ভালো না থাকলে তাকিয়ে থেকো কিছুক্ষণ, স্বস্তি পাবে--- তিমির বলত। আমি কী করে মুখ দেখাব তিমিরের কাছে --- বলেই সে শব্দ করে কেঁদে ওঠে এবং উপুড় হয়ে মাটিতে মুখ গুঁজে জিভ দিয়ে টেনে নিচ্ছিল, মাটির নিচে লুকোনো জল। সে মায়ের কোল খুঁজছিল। সে তিমিরের পদ্মপাতার মতো দুটো হাতের তালুবন্দী সুখ খুঁজছিল।

সে, বালতি এবং জল এল। 

                                                      HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]