free mobile website builder

মুক্তগদ্য        Home           
শুভেশ চৌধুরী      
দিনের আলোয়


বারবার দেখেছি, দিনের আলোয় যা প্রকাশিত হয় রাত্রি তা লুকিয়ে ফেলে। মুছে ফেলে কিছু ঘাম, রক্ত, পাপ।
আমরা জানি তো সেই দিনগুলির ভেতর যেখানে মাথা থেকে বেরিয়ে পড়ে হাজার হাজার ট্রাক্টর। চষে ফেলে মাইলের পর মাইল জমি। হাত দুটো ক্রমাগত দাগ বসায়, আঁক কষে, আঙুল দিয়ে চেপে ধরে কিবোর্ড। আর হাজার হাজার শব্দের লাইন দিয়ে তৈরি হয় শব্দের বাহিনী। পা দুটো অভিকর্ষের সাথে কসরৎ করে তৈরি করে নেয় সৌধ, মিনার আর স্তম্ভ।

কোনগুলি মিথ্যা ? এই স্বপ্ন ? না, জাগরণ ? ঘুম তো জানি ফাঁকি, এক অতল গহ্বর, এক কালো রাত্রি।
স্বপ্নকে দেখা যায় না। স্বপ্ন কাচ দিয়ে ঢাকা এক জীবন্ত প্রাণ। নড়েচড়ে নানা ভঙ্গিতে ইশারা করে আন্দোলিত করে, হাসায়, মুখরিত করে তোলে ঘুমকে। ঘুম ভেঙে যায়, শুরু হয় বাঁচা। শুরু হয় ভুলের, ক্রমশ মোহবন্দি হয়ে পড়ে কর্ম।
কর্ম লোহাকে কাটে। আগুন জ্বালায়, নেভায়। কর্ম হয়ে পড়ে একটি জীবনের উদ্দেশ্য। ধর্ম, সৃষ্টির। কখনো শব্দ করে তলিয়ে যায় পাড়ের মাটি।
আমি কি বিশ্বাস করবো যতসব ভাঙার গান, পাথর ভাঙার শ্রম সব সৌধ নির্মাণের পক্ষে ? অবিশ্বাস করাও যায় না। পুরোনো বাড়ি ভেঙে পড়েছে, সেখানে পোষাক বদল করে আবার দাঁড়িয়ে গেছে নয়া ইমারত।
আমি শুধু এক প্রবল বিস্ফোরণের মুখে এই কাচের আবদ্ধ স্বপ্ন। না, বিস্ফোরণের পরও বেঁচে থাকবে স্বপ্নটি। বহু যুগ পরে তার মমিটি আবিষ্কৃত হবে। আর সেদিনও সবাইকে স্বীকার করে নিতে হবে সে ছিল জীবন্ত, গতিময় ছিল তার শুরু ও শেষের মধ্যবর্তী সেঁতুটি। যার নির্মাণে সে ছিল মুখ্য শিল্পী।

আমি তলিয়ে যেতে দেখেছি বহু। তারা কি হারিয়ে যায় ? প্রশ্ন করে মন। আমি দেখি যা যা, সব সত্য। যা চোখের বাইরে চলে যায় সব মিথ্যা। আমাকে প্রশ্ন করেন কবি --- আজ ও কালের মধ্যে যারা নবাগত তারা সেদিন কোথায় ছিল ? বা যারা প্রবীণ ছিলেন তারা আজকে কজন বাড়ি ফিরে গেছেন ? তোমার নিমন্ত্রণে আজ যারা সাড়া দিয়েছেন তারা যেমন সত্য, ঐ যারা নিমন্ত্রণ রক্ষা করেননি তারাও অঙ্কটির বাইরে নন। এইগুলি বাড়ি না মৌচাক, কোঠায় কোঠায় জমা করেছে রসদ, ঔষধ। সারাদিন তাদের ফুল আর ধানের সাথে কথোপকথন। সারাদিন বাগান আর অফিস। হিসেব করে কতটা এগোনো যায়, পিছিয়ে আসা যায়, তবু টিকে থাকার চেষ্টায়, ভালো থাকার চেষ্টায় এগোতে হয় পিছিয়ে পড়তে হয়।
কোনবার যদি ব্যর্থ হয়ে পড়ি, হিসেবের ভুল হয় বা খেলাটা সম্বন্ধে কোন পূর্ব ধারণা ছাড়া খেলতে আসা হয়, হাঁটু ভেঙে পড়ে, মাথা নিচু হয়ে যায়। হাত দুটো শরীর থেকে আলাদা হয়ে ঝুলে পড়ে, চোখ দুটো হতাশ দেখায়।
এতসব বলার আগে বলতে হয় স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে আছে কি, বর্ণমালার মালা গাঁথা হয়েছে কি সেখানে, ছক কেটে সংখ্যারা সেখানে চলাচল করছে কি, সেসব দেখতে হয়।
কারা জানি বলাবলি করে কানে কানে, আমাদের নেই। নেই বলতে ভাত নেই, পোষাক নেই, হাত নেই। বলতে গেলে হেই পান্সি চল্ --- এই বলে ডেকে উঠে বসব এমন জীবনতরি নেই। কী করি বল্, ছিনিয়ে নেব, লুটে নেব এমন ক্রিয়া হামেশাই সংগঠিত হয়ে পড়ে।

কী বলব, রাজ্য বলতে সীমা, আর তার উপশিরা, রক্ত চলাচল। হৃৎপিণ্ডটিকে আঘাত দিলে স্বভাবতই রাজ্য নামের মানুষটি হেরে যায়। হারিয়ে যায় দেশ নামের ভাষাটি। ঘরটিতে নির্জনতা এসে বাসা বাঁধে।

নামহীনের একটি নামকরণ তোমার কাছ থেকে আশা করছি। বহু নামের ভিড়ে আরও অসংখ্য মানুষ নামহীন কর্মহীন যশহীন বিত্তহীন হয়ে আছে। নাম দাও তাকে। ডেকে উঠুক লক্ষ মানুষ সেই নামে। গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে নগরে, নগর থেকে দেশে। দেশ থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক তার নাম। নাহলে কীভাবে হবে বিশ্বায়ন। নামহীনকে তুমি কীভাবে একটি কুয়োতলা থেকে আহ্বান জানাবে সমুদ্রে ? চিনবে আকাশ, চোখ খুঁজবে মুক্তি, দৃষ্টি বাধা পাবেনা। জগতে আনন্দযজ্ঞে, তোমার নিমন্ত্রণটি তুমি স্বীকার করে নিও। যে ফুলটি তুমি আবিষ্কার করেছ তোমার পথ চলায়, পথের পাশে ঘাসে, বেগুনী নীল সাদা ফুল সে তোমাকে সজোরে চুম্বন করে আর বলে ভালোবাসো আমাকে। আমি কোন নারীর থেকেও সুন্দর, কোন বিত্ত থেকেও মোহময়, কোনও মন্ত্র থেকেও অনন্য এক উচ্চারণ হয়ে উঠব তোমার কাছে। তুমি ভালোবাসো, তুমি পাশ ফিরে দাঁড়াও হিংসা আর ক্রোধ থেকে। শিশুটি খেলছে, ফুলটি খেলছে ঘাসে। শব্দহীন তবু এক ভাষাময় ভালোবাসাকে তুমি স্বীকার করে নাও।
হিংসা কি কোনোদিন সুন্দর হয়, দৃষ্টিনন্দন হয় একটি আঘাত ? তবু আঘাত হচ্ছে, সমপক্ষ হাততালি দিচ্ছে। একে কি বলে, পার্টিজান অনুভব ? সমস্ত আঘাত সয়ে নেয় বালুভরা বস্তাটি। আঘাতের পর আঘাত আসে। একবার গড়া হয়, আরেকবার ভাঙা হয়। আবার গড়া হয়। তাহলে হিংসা পরে নেয় ভালোবাসার পোষাক। ভালোবাসাকে অস্বীকার করলে জেগে ওঠে হিংসা। এক হাতে অভয়, আরেক হাতে অস্ত্র --- এই তোমার চরিত্র।
বুঝতে পারছি, আমি একা নই। আমি দুইটি ভাগে বিভক্ত। আমি একটি জন্ম থেকে শুরু করেছিলাম। আজ দেখতে পাচ্ছি পূর্বে আরও বহু জন্ম সংঘটিত হয়েছে। আমি একটি ‘এক’-কে ভেবেছিলাম শূন্য পরবর্তী ঘটনা। কিন্তু হায়, ‘এক’ বহু ‘এক’-কে নিয়ে গড়া একটি ‘এক’। তাহলে আমার জন্মটি কোনও একক ঘটনা নয়। বহু ঘটনার সাথে যুক্ত একটি ঘটনা। বৃষ্টিধারার একটি বারিবিন্দু। আমি গর্বিত তোমার সাথে নিজেকে যুক্ত করে। হে জীবন, তোর সাথে আজও একটি অক্ষর হয়ে ঝুলে রয়েছি, একটি শব্দ হয়ে ওঠার জন্য।
দিনান্তে পর্যবাসিত শ্রমের তুলনামূলক বিচার হয়। আহ্বান করব এই সন্ধ্যায় কোনও রাতের তারাকে, যে আলো হাতে আসন্ন রাত্রির কালো অন্ধকারে নিজেকে উন্মোচন করে আমাকে তার আলোতে অন্ধ করে দেবে। আমার কাছে দৃশ্য হবে সুর। স্পর্শ পাবে দেহের। দেহ কাঁদবে, হাসবে, মন হারিয়ে যাবে ঐ শরীরে। কেটে যাবে আঁধারের পর আঁধার। একদিন ঐ আঁধারের শেষে নিসর্গ মুক্তির গান গাইবে। চোখ দুটো ঐ নিমীলিত আঁধারের পর দুটো পাতার ফাঁকে প্রভাতের ফুলের মতো ফুটে উঠবে। সূর্য হবে দৃশ্য। আর আমি বলব, এই তাপে শুকিয়ে ফেল তোমার রাত্রি-ভেজা মনকে। তপ্ত করে গলিয়ে নাও শরীরকে। ধার করে নাও তোমার ধারণ করে রাখা অস্ত্রসমূহকে।
এইভাবে দিন ও রাত্রির খেলায় কালো ও রং-এর মাঝে, সাদা আর কালোর মধ্যে ---- নিজেকে খুঁজি শ্রম আর অবকাশের মাঝে। গান আর গানহীনতায় সুর আর সুরহীনতায় জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে স্বপ্ন আর বাস্তবতায় বেঁচে আছি।  


                                                 HOME

 (এই লেখাটি শেয়ার করুন)