web development software

কবিতা            Home       
কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর একটি দীর্ঘ কবিতা


চক্রবাক

এক
আকাশ দেখে আমাদের ছাতা বদলের অভ্যেস
ঋতুর রঙে পোষাক
গোপনে এক দুর্বিনীত ইঁদুর
ছাতার অন্ধকারে, পোষাকের রঙে ঘষে দাঁত
সূর্য উঠলে এসব ভাস্বর হয়
আমরা গর্ত খুঁজি আর
ইঁদুর দখল করে আমাদের আশ্রয়

দুই
কী করবো
আমি যে তাদের মতো হতে পারি না
তারা তো চমৎকার সাঁতার কাটে স্রোতে
পুকুরে সাঁতার কেটে আমার অভ্যেস
চারদিকেই বন্দি পাড় স্রোতহীন
আমি যন্ত্রণায় ঘোলা করি জল, পুকুরের রাগ নেই
মুহূর্তেই স্থির, ভিজে বারুদের স্তূপ রৌদ্রে মেলে
ফিরে আসি ঘরে।

তিন
টাকার পিঠে লিখে দিলাম---‘ভালোবাসি, ফিরে এসো আবার’
ভালোবাসা নীল হয়ে কালো ঘরে স্তূপ হয়ে ওঠে
আমি অপেক্ষা করি
এভাবে প্রতিদিন সূর্যাস্ত হয় আমার দুয়ারে

চার
জিজ্ঞেস করবো আর কতো ?
এতো প্রশ্নে জিজ্ঞাসা খড়্গ হয়ে ঝোলে

জবাব নেই আমার রবহীন সময়
খান খান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরময়

পাঁচ
বলি আমিঃ তুমিই প্রধান
সুখী হয়ে ফিরে যায় তারা
ভিড়ের ফাঁকে গা বাঁচিয়ে চলে এলে নিরাপদ
বিপদসীমার আগে কখন যে মিছিলের ফাঁকে তুমি হাওয়া
আহতকে হাসপাতালে সান্ত্বনা দিয়ে চুপিচুপি
তুমি এদিকেও ওদিকেও
ভ্রমর বুদ্ধিজীবী --- আছো ধুতুরায় আছো গোলাপে
পলাশেও আছো আছো রজনিগন্ধায়

ছয়
মুঠিকয় মাটি দিয়ে বানালাম গুটিকয় মানুষ
চড়ালাম রং
শো-কেসে ভুখা-নাঙা মানুষের মূর্তি রেখে
ভারতীয় শিল্পী আমি কাফ্রির চোখে কাঁদি
মহত্ব বটে! এইভাবে কাটাখালে বয়ে যায় জল
রঙিন টিভির কাঁচে দাঙ্গার রক্ত দেখে বলিঃ
দারুণ ক্যামেরার কাজ ! রিয়্যাললি !

সাত
মঞ্চে এসে দাঁড়াল যুবক
মা-বোনের ইজ্জৎ নিয়ে বলে গেল কথা
মিড় আর গমকে বাজে তুমুল তালিয়া
মড়মড় শব্দে ভাঙে বনস্পতি

কথার শিল্পে বুঁদ হয়ে যে যার ঘরে যাই চলে
ঘরের সিঁড়িতে ধর্ষিত রক্তের দাগ
তখনও অমলিন

আট
কূলে ফেলে গেছে কেউ সদ্যোজাত শিশু
নদীর পাড়ের মায়া ----
তাকে দেখো।
তোমার ছায়ায় কাঁপে সন্তানভুক মায়ের জিভ
লজ্জায় নত হয়ে ঝুঁকে পড়ে সমস্ত আকাশ
আজ প্রতিবাদ, আজ দিনও না রাত্রিও না

নয়
বাতাস বাজালো আজ ধর্মের ঢোল
মুখে তোর এ কী বোল্, ছিঃ !
বর্ম দিয়ে কি ঢাকে মর্মের ঘা ?
গলদঘর্ম হে বাবরি চুলের মগজ
নাচবে ক’দিন আর আমার চর্মের চপ্পলে !

নিহত হাড়ের হর্ম্য ধসে পড়ে
মিথ্যের আরতি ও আজানে

দশ
বলি সরব হও কিন্তু চেঁচিও না
অপেক্ষার বর্ণগুলি দীর্ঘ-দীর্ঘদিন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে
ভাবি আমি---
একটি পঙক্তি যদি ঢেউ তোলে নিঃসাড় বুকে
অসংখ্য শব্দের থেকে একটিও জং ধরা নুড়ি যদি
গিয়ে লাগে কোনদিন মৌমাছির চাকে
একটিও বৃত্ত এঁকে ভেঙে দেয় কোন স্থির অবাক পুকুর

মাছি আমি কানা
দিযামিনীর মানে জানি না।

এগার
টিলার গা বেয়ে গড়িয়ে নামছে বাসন-কোসন
প্রতীকের অভাবে আমি খুঁজে পাই অভাবের উপমা
দারুণ ক্ষুধার রাজ্য এঁকে ফেলি এই বকলমে
ভাষণ শুনে ঝনঝন বেজে ওঠে থালা
হাঁড়ি ভরে কথা নিয়ে অন্নপূর্ণা চুলোয় চাপায়
সেদ্ধ হয় সেদ্ধ হয়, দুঃস্বপ্নগুলি ফোটে টগবগ টগবগ

বার
শাসনের দড়ি পড়ে আছে আসনের কাছে
সহসা কিলবিল নড়ে ওঠে প্রভুর পায়ের ইঙ্গিতে
সর্পজ্ঞানে সরে আসি ভয়ে
বেদে এসে জানায় সর্পের জেদ
হাতের শেকড় শুঁকে মাথা নুয়ে ফিরে যাই যে যার ডেরায়
প্রতিবাদ ভুলে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে স্মারকলিপির ভাষা
মায়াদর্পণে ভাসে আকর্ণ অট্টমুখ হাসি

তের
বসন্ত এসেছে খবর একটাই
কিন্তু এবার শুধু
পাশের বাড়ির পালিত বৃক্ষের গায়
ঠিক যে জায়গাটায় পরের ঘরে ডিম পেড়ে এসে
বসেছে নিশ্চিন্ত কোকিল
ডাকতে থাকা কোকিলকে আমি কোনদিন দেখিনি
পাখির স্বরে ক্ষেপে উঠছে ঝরা সংসারের ডালপালা
উঠানে ছড়ানো ছাই
ভাবের পাঠশালায়
যেন কিছুদিন জিরোতে এসেছে অভাব।

চৌদ্দ
রান্নাঘরের চূড়ায় একদিন ঘষে ঘষে জ্বলছিলো আগুন
সপ্তর্ষির শেষ তারাটি ছুঁয়েছিলো আমাদের ডেরা
দীর্ঘদিনের খরায় যখন শুকিয়ে উঠেছিলো উনুন
তারার আগুনে নেচে উঠেছিলো হাঁড়ি-পাতিলের তলা

বহুদিন বাদে আমাদের ঘরে ফুটেছিলো আকালের নবান্ন

পনের
চৈতন্যে মড়ক
ঘুরে-ফিরে তাই একই কথা চক্রাকারে ---
দুই পা রাখার একটুখানি জমি, মাথার ওপর একটু আকাশ ঢাকা
লজ্জা ঢাকার বিঘৎ দুয়েক ফালি, ভোগের পাতে সামান্য সুদিন

এই যে চক্রবাক, বক্রপথে ওঠে নামে গড়ায়
বানকড়ালির ধুলোয় ধোঁয়ায় খরায় চরায় জরায়।


                                                  HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]