web builder software

কবিতা            Home      
দিলীপ দাসের একটি দীর্ঘ কবিতা



ছাগল পালনের উন্নত পদ্ধতি -- বিশুদ্ধ আঙ্গিকে, মানবিক সৌহার্দে

"ছাগল পালন একটি লাভজনক পেশা।"

চার হাত অথবা পাঁচ হাত প্রথাগত দড়ি,
নতুবা আট ন-হাত দৈর্ঘের উদাস স্বাধীনতা,
এইটুকুই তোমার পৃথিবী।
তাই বা কম কী ?
কেউ কেউ তো তাও পায় না।
সাড়ে তিন হাত রশির দীর্ঘ পরমায়ুতে
কারো পায়ের তলায় তো শুধু মরুভূমির বালু।
পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত
যাদের চারণ সীমানা,
ছ বাই আট ফুট খাঁচার দুনিয়ায় তারাও
দিব্যি মানিয়ে নেয়। পৃথিবী গোলাকার,
আর রসালো। একেবারে কমলালেবুর মতো
এবং তার সীমার মধ্যে কোথাও অসীম নেই
এই অজানা কুহক-সন্ধান
তোমাকে দেখে সবাই শিখুক।

আসল কথা ওই মানিয়ে নেওয়া।
কে কতটুকু মানতে পারল
তা দিয়েই তার দৌড়ের ঊর্ধ্বসীমা, মানপত্র, স্মারক-রচনা।

"ছাগল পালনে বেশি মূলধন লাগে না"

দড়ির এটুকু দৈর্ঘ
তোমার শিং আর দড়ির জন্য নয়, মনে রেখো।
আমাদের দখল থেকে পরিমিত ঘাস
ঘাসের প্রাকৃতিক সবুজ,
নিখরচায় রোদ
অতি রোদ্দুরে নিয়ন্ত্রিত ছায়া,
বৃষ্টিতে ঘরের ছাঁচের নির্লিপ্ত নিরাপত্তা,
সবটুকু তোমাকে এজন্যে দিয়েছি ---
একদিন, তুমি
আমাদের দেবে, তোমার সর্বস্ব।
তোমার তরুণ শরীর,
তোমার উরুর মাংসল লবণের স্বাদ
যৌবন-ভারাক্রান্ত ইশারা,
তোমার পিঙ্গল চোখের শেষ বিশ্বাস ---

আর সেই বিশ্বাস – আঃ কী মধুর – তা দেখে
নেচে উঠবে আমাদের অরণ্য-উল্লাস,
গনগনে রক্তের মধ্যে মিষ্টি ছটফট,
তারুণ্য-উচ্ছল অস্থিরতা,
তারপর ……… তারপর ………
তোমার সাড়া শরীর জুড়ে
আহঃ এ কী লাবণ্য পণ্য-প্রাণ, স্নানঘরে মিটিমিটি গান,
কী সুস্বাদু … আহা … কী উচ্ছল … জোছনা-প্লাবন,
মিট-মশালার গানে সারা পাড়া হয়েছে মুখর…

"পুরুষ ছাগলকে ২ মাস বয়সে খাসি করতে হবে। এতে শরীরের বাড় কিছুটা বেশি হয়।"

ভীষণ অপচয়ী তুই।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখিস সব।
হাতের নাগালের বাইরে যা কিছু
তুই ফিরেও দেখিস না।
উঁচুতে ঝুলিয়ে নেব ডালপাতা,
আর দেখব। তোর ঘাড়ে-গর্দানে কিরকম
ত্রিবলি-মেদুর ঢেউ খেলা করছে।
তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখব ---
হাতছানি কেমন চোখ টিপে ডাকছে।

জিভের জল চুষে চুষে খাব।

"পুরুষ ও স্ত্রী ছাগলের বয়স ৩ বছর হবার আগেই দ্বিতীয় লটের বাচ্চা বেছে নিতে হবে।"

তোর শৈশব,
তোর যৌবন,
তোর সর্বস্ব,
সবই কি আমাদের জন্য নয় ?
তোর মাকে, তোর বাবাকে পুষেছি ---
তোর জন্য।
আবার তোকে পুষেছি ---
তোর ছেলেমেয়ের জন্যে।

তোর স্বর্গ-নরক
পাপ-পুণ্য
ইহকাল-পরকাল
সবই তো আমার জন্য
আমাদের জন্য

আমরা পৃথিবীটা শাসন করছি
ভোগ করছি,
দুমড়োচ্ছি, মুচড়োচ্ছি
চিবুচ্ছি, ফেলছি, দু-পায়ে দলছি,
আবার,
আমরা কিন্তু তোর সুঠাম বিকাশের কথাও ভাবছি।
কী করে তুই তাড়াতাড়ি পোয়াতি হবি,
কী করে কত কম সময়ে
তুই প্রজননের উপযুক্ত হবি, এজন্যে,
আমাদের বিজ্ঞান, আমাদের প্রযুক্তি,
আমাদের ধর্ম ও দর্শনের সারাৎসার
অফুরন্ত হিসেব-নিকেশ
আমাদের অনিঃশেষ গবেষণা।
তোর জন্য এত কিছু করছি,
আর তুই আমাদের ওই নশ্বরতাটুকু
দিতে পারবি না ?

"মাসে বা সপ্তাহে ক’টি ছাগল বেচা যাবে তা ঠিক করতে হবে। সেই অনুসারে মাংস ব্যবসায়ীর সাথে চুক্তি করতে হবে।"

তুই তো পুণ্যের বাহন
স্বর্গপথ নির্মাণের ভাগ্যবান উৎসর্গ ---
তোকে কি আমরা বেছে নিইনি ?
দেবতাদের মহান পরিতুষ্টির জন্য,
ভুবন মঙ্গলের জন্য
তোকেই কি পরম পবিত্র আমরা উৎসারণ করিনি ?
তোকে পেয়ে, দেখ, দেবতারা
খুশিতে, পরিতৃপ্তিতে,
কেমন লোলজিহ্ব হয়েছেন ?
ভেবে দেখ, তুই কত বড় পরার্থ-পুরাণ রচয়িতা ?

"এক বছর বয়স হলে স্ত্রী ছাগলকে প্রজননের কাজে ব্যবহার করতে হবে। পুরুষ ছাগলকে ব্যবহার করতে হবে দেড় বছর বয়সের পর।" 

তুই যখন চেয়েছিস
তোর জন্য স্বাস্থ্যবান হোলা মদ্দ এনেছি।
এই হারামজাদা, তুই যখনই
কামুকতায় দিশেহারা হয়েছিস
হৃষ্টপুষ্ট মাগী এনে দিই নি ?

এসব কি আমাদের জন্য ?
তোদের জন্য নয় ?

এসব কিছুই নয় ?
তারপরও তোর স্থির দু-চোখে দেখব ফরিয়াদ,
দেখব ধিক্কার ?
এরপরও বলবি,
আমরা লোভের সন্তান,
আমরা ক্ষমতার দাস ?

"ছোটো অবস্থাতেই পশু চিকিৎসকের সাহায্য নিয়ে শিং নষ্ট করে দিতে হবে।"

তুই লাথি মারতে পারিস,
জানি, তুই শিং উঁচিয়ে তেড়ে আসতে পারিস।
তোর প্রতিরোধ আমি ছেঁটে দেব,
সেই সকালে, যখন তুই অবুঝ।
তোর নখ কেটে দেব।
তোর গায়ে আদরের তেল মেখে দেব,
তোকে আমাদের আইনি সহবৎ শেখাব।
নয় হাত দড়িতে যদি না কুলোয়
না হয় আরও এক হাত …… তার বেশি নয়…

"৪ বছর বয়সের পর ছাগল যে কোনও দামে বেঁচে দেওয়াই ভালো।"

তোর উলানের স্ফীতির জন্য,
নধর স্বাস্থ্যের জন্য,
তোর সন্তানদের বেড়ে ওঠার জন্য,
আমরা কি ঘাস দিইনি ?
লতাপাতা এনে দিইনি ?
দানা-ভূষি দিইনি ?

আমরা কি থাবার বিস্তারের জন্য,
সুখ ও সীমাহীন বিলাসের জন্য,
তোদের শুধু বঞ্চিতই করেছি ?

আমরা কি মানবতার জন্য চিৎকার করিনি ?
আমরা কি পশুক্লেশ নিবারণে সভা করিনি ?
আমরা কি নিরামিষ আহারের তালিকা তৈরি করিনি ?
আমরা কি গল্প-কবিতায় ছড়িয়ে দিইনি দূষিত বীর্যের অমর কাৎরানি ?
ওরে আমরা কি গণতন্ত্রের জন্য ভোট করিনি ?
প্রতি বছর স্বাধীনতার পতাকা তুলিনি ?

তারপরও বলবি,
আমরা কিছুই করিনি ?


                                                  HOME

[এই লেখাটা শেয়ার করুন]