drag and drop website builder

মুক্তগদ্য        Home       
নকুল রায়
চুপ শব্দ খুলে নেবো



আমি আর আমার জীবন । বেশ ছিলাম।
এই পরমাত্মীয় সম্পর্কে ভাগ বসাতে এলো কবিতা। একদিন নয়, প্রতিক্ষণ। যে যেরকম স্বভাবের, তাকে সে-ভাবেই চিনি বলে আমার অহংকার ছিলো । ভেঙে গেল একদিন। আমি দুটো কথা লিখে ফেললাম এভাবে-----

‘আমার হৃদয়ের কান্না আঁচলে পড়ে—
মুছিয়ে দিলো মায়ের চোখের হাসি।'

এই প্রশ্রয়ে আমি প্রথম নারীকে চিনলাম। মা-কে দেখেই প্রথম বুঝতে পারলাম মায়ের কাছে আমি কবিতা। রচনা। সৃষ্টি। 
বাবা হাসছেন নিকট দূর থেকে।
আমিও একদিন বাবা হলাম। দুই সন্তানের বাবা।
এরা আমার কবিতা। রচনা। সৃষ্টি।
স্ত্রীকে পেলাম তিনটি কবিতায় – জননী, কন্যা এবং বন্ধু।
যা বলছিলাম।
আমি আর আমার জীবন । বেশ ছিলাম।
এরমধ্যে এতগুলো বিষয়-চরিত্র ঢুকে গেলো, যার দায়িত্বভার অনুভূতির। অনুভবের এতো স্রোত, অপ্রতিরোধ্য বেগ আমার জীবনের ব্যক্তিকে আক্রমণ করে, মাঝে মাঝে চঞ্চল করে তোলে। চারদিক থেকে ছুটে আসছে অজানা শব্দের অর্থহীন স্রোত। আসলে, কোন শব্দেই অর্থ থাকে না, থাকে শব্দের অনুভব। সেই অনুভবে বিশ্বের সকল শব্দই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন। তাকে একটা অর্থ বা মানে দাঁড় করাতে হবে আরেকটি বা একাধিক শব্দে, যেখানে মূল শব্দটির একটি নিকট অর্থ দাঁড়ায়। দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। জীবন, বৃক্ষ, মৃত, আকাশ, ভালোবাসা, মৃত্তিকা।

জীবন
জীবন আসলে কী ? চিমটি কেটে অনুভব করা, নাকি নিজের হৃৎপিণ্ডে ফুঁ টের পাওয়া ? আমার জীবন আমার কাছে বেঁচে থাকা। এখন প্রশ্ন, আমার কাছে যা বেঁচে থাকা অন্য কারোর কাছে তা মরে থাকাও হতে পারে। হাত-পা-মাথা-ঘিলু-লিঙ্গ-চেতনা সবই যখন আমার, তবে তো এরা আমারই আদেশ পালন করার কথা। কিন্তু না। হত্যাকারী যে-হাতে হত্যা করে সে আবার সেই হাতেই খায়, পোশাক পরে এবং রক্ত মুছে চলে যায় নিজস্ব ব্যারাকে। বিজ্ঞান চেতনার দ্বারা, বুদ্ধি ও কৌশল দ্বারা এবং শার্লক হোমসের মতো অনুভূতিশীল প্রতিভাধর গোয়েন্দাদের মতো কেউ কেউ সেই হত্যাকারীকে চিহ্নিত করতে পারে, কিন্তু সাধুর জীবন হত্যাকারীর জীবন, বেঁচে থেকেও তারা আলাদা। স্বতন্ত্র মেধার লোক।
একটি শিশুর কৌতূহল ও খেলা করার প্রবণতা বেঁচে থাকার অর্থ বোঝার চেয়েও সে বেশি বোঝে তার চেতনার রঙে। তাই, আমি যে আমার জীবনে বেঁচে থাকার অর্থে বললাম, উল্লিখিত বিষয়গুলির সঙ্গে না মিললেও আমার নিজের কাছে আমার জীবন স্বার্থপর। এই স্বার্থপর অর্থপূর্ণ জীবনের বহু মূল্যবান বৈশিষ্ট্য আমার স্বল্প মেধার কারণেই শুধুমাত্র স্বার্থপর। পরার্থপরতার কাজটি শুরু হয় সৃষ্টি চেতনা থেকে। অনেক মাধ্যমের মধ্যে কবিতা একটি শিল্পকর্মের, সৃষ্টিদাসের আজ্ঞাবাহক মাত্র, আর সেটা বা সেই সৃষ্ট-কবিতা কবির জীবন ও অনুভব --- চেতনার উপর নির্ভর করে।
জীবন যা তাই।
কিন্তু ব্যক্তি ? ছোট হয় বড় হয় স্বভাবে।

বৃক্ষ
আমার কাছে অবাক লাগে, বৃক্ষ এমন এক প্রাণস্বর যে এর জীবনে কোনদিন কোনকিছু হত্যা না-করে, জীবহত্যা না-করে কী সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে। সোজা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়ানো বৃক্ষের সারি, সর্বদাই মনে হয় --- এই পথ ধরে যাওয়া-আসার সময় নীরবে আমাকে সেলাম জানাচ্ছে। আমি যে মানুষ! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রতারক। অথবা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানব সন্তানের পরিচয়ও কারো কারোর জীবনে দেখা পাওয়া গেছে, সংখ্যায় এতো কম যে, বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করলে তা দুর্বল ঠেকে।
আমার বাড়ির উঠোন জুড়ে যে কামরাঙা গাছটি তার শৈশব থেকেই তার পরিচয়লাভে আমি ধন্য থেকেছি; ভাই-ভাই লড়াই করে একদিন গাছটিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হোলো তার যৌবনেই। ঘর উঠবে। জমি ভাগ হোলো। তাকে হত্যা করে তার জায়গায় একটি একচালা ঘর বানিয়ে টুনাটনি ঘর বাঁধলাম।
কোন বৃক্ষ, করাত বা কুঠার নিয়ে কোপ বসালেও, সেই বৃক্ষ তার কোনো ডালপালা-পাতা দিয়ে খুনিকে জড়িয়ে ধরে বাধা দেয় না।
মানুষ হিসেবে অনেক পরাজয়ের ভেতর একটি পরাজয়। কোন কোন নিরীহ মানুষ শোষকের দ্বারা খুনের রক্তে রঞ্জিত হয়। বৃক্ষের এই আত্মত্যাগে আমার চোখে জল আসার কথা। আসে না। সেখানেও আমার দুষ্টবুদ্ধির জল। চেতনার অশ্রুবাহী চক্ষু নয়। কবিতা লিখে আমি আমার প্রতিশোধ জ্ঞাপন করি।

মৃত
পৃথিবীর প্রথম মানুষটি মরেছিলো, এটা এখন বেঁচে থেকে বাস্তব জীবনেতিহাস থেকেই জানা যায়।
পৃথিবীর প্রথম মানবী, আমাদের মহান মা, যিনি অকাতরে মরে গেছেন পরবর্তী মানুষের জন্ম দিয়ে। তিনি কী খেতেন কীভাবে শুয়ে-বসে এখনকার আমাদের বেঁচে থাকার সমস্ত আদরের আয়োজন করে গেছেন, জানি না। সেই মৃতকে প্রণাম। সেই মৃত্যুকে জীবনের প্রণাম।

আকাশ
সেই নীল মহাশূন্য। অন্তরীক্ষ। যার যেখানে দাঁড়িয়ে দেখার অভ্যেস তার মাথায়ই সে বাস করে। যত নক্ষত্র-গ্রহ-উল্কা-ছায়াপথ থাকুক, আমার নির্জনবাস জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে যতটুকুই দেখা যাক --- সেই দেখতে-পাওয়া সীমা আমার আকাশ।

ভালোবাসা
লালন ফকির বলেছেন, ‘আমার আপন খবর আপনার হয় না।‘ আবার আরেকটি গানে বলেছেন, ‘আপন ঘরের পরের আমি।‘ এ সমস্ত ভাবনার ব্যাখ্যা আমাদের বাউল-দর্শনে আছে। ভালোবাসার কোন শব্দ নেই। নিঃশব্দ চেতনার যে কবিতা এই মহাবিশ্বের আবিষ্কৃত জীবন তার অর্থহীন ক্রন্দন ও হাস্য-কলরোলেই বেঁচে ওঠার হাতছানি। ভালোবাসা মূলতঃ স্বার্থপর।

মৃত্তিকা
যার উপর বা পিঠে আমাদের এতো অহংকার সে কিন্তু এর দাম চায় না। সে জানে, মানুষ যতো বিশাল চৈতন্যের অধিকারীই হোক, সাড়ে তিন-হাত জায়গা তার থাকেই। মহাবিশ্বে তার জায়গা মাতৃজঠরের মতো। জীবন এবং মৃত্যুর শ্রেষ্ঠ প্রহরী মাটি।


আমি আর আমার জীবন। বেশ ছিলাম ।
কিন্তু আমার জীবনের পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়ার পরও, একদমে আরেকটি লাফ দেয়ার অপেক্ষায়, ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছি।
কবিতার শরীর থেকে শব্দগুলি খুলে নিলেও, ----- আশ্চর্য, কবিতাটি নগ্ন হোলো না! এটা ভাবতে ভাবতে কত সূর্যাস্ত পেরিয়ে যাচ্ছি – আরেকটি মনের ভোর ধরবো বলে।  

   
                                                             HOME

 (এই লেখাটি শেয়ার করুন)